
দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশ মেনে ‘ধরা খাওয়া’ জাতীয় পার্টির নেতারা এখন তাঁর ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। চেয়ারম্যানের নির্দেশ অমান্য করে যাঁরা মন্ত্রী-সাংসদ হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা এখন একজোট হচ্ছেন।
এরশাদের কথামতো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে বঞ্চিত হওয়া নেতাদের একটা বড় অংশ তাঁদের পরিণতির জন্য মূলত দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে দায়ী করছেন। অন্য একটি অংশের অভিযোগের তীর খোদ এরশাদের দিকে। তাঁদের বক্তব্য হলো, তাঁদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বলে যেভাবেই হোক এরশাদ ঠিকই প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে বসে আছেন।
তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেছেন, সরকারে থাকা না-থাকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নেতা-কর্মীদের মনোভাব জানতে আরও সময়ের প্রয়োজন।
এদিকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর কমপক্ষে তিনজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেছেন, তাঁরা সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দলের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানাবেন। তাঁদের এই তালিকায় প্রথমেই আছেন মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার ও ঢাকা থেকে নির্বাচিত সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ।
বঞ্চিত নেতারা মনে করছেন, পরিস্থিতি আরেকটু স্বাভাবিক হলেই চেয়ারম্যান বৈঠক ডাকবেন। সেখানেই ‘আপত্কালীন সময়’ কার কী ভূমিকা ছিল, তা তাঁরা তুলে ধরবেন।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, এরশাদ যখন যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তা-ই তাঁরা মেনে নিয়েছেন। এরশাদ একক নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁরা তাও মেনে নিয়েছিলেন। তাঁরা ২৯৯টি আসনে নির্বাচনে লড়ার জন্য মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন। এরশাদ ৩ ডিসেম্বর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। নির্বাচনে অংশ নেন মাত্র ৮৪ জন। কিন্তু দলের মহাসচিব তাঁদের বিভ্রান্ত করেছেন। মহাসচিব সিএমএইচে থাকা এরশাদের ‘মুক্তি’ চেয়ে নেতা-কর্মীদের পোস্টার সাঁটতে বলে নিজে হেলিকপ্টারে করে নির্বাচনী এলাকায় গেছেন এবং জনসংযোগ করেছেন। তিনি ও তাঁর স্ত্রী দুজনেই সাংসদ হয়েছেন।
জাতীয় যুব সংহতির একজন প্রভাবশালী নেতা বলেছেন, মহাসচিব শুধু জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের নয়, সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদেরও বিভ্রান্ত করেছেন। তাঁরা এরশাদের মুক্তির দাবিতে তেমনভাবে সংগঠিত হতে পারেননি, আবার নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারেও নামতে পারেননি। কিন্তু মহাসচিব নিজে লাভবান হয়েছেন।
দলের বিভিন্ন সূত্র এখন তাঁদের এই বলে আশ্বস্ত করছে যে, বঞ্চিতদের আর্থিকভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায় কি না, এরশাদ সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেবেন।
সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেছেন, এরশাদকে আওয়ামী লীগের পক্ষে না থাকার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন তাঁর রাজনৈতিক মুখপাত্র কাজী ফিরোজ রশীদ। কিন্তু এরশাদকে সিএমএইচে নেওয়ার এক দিনের মাথায় তিনি রওশন এরশাদের বাসায় ‘ধরণা’ দিতে শুরু করেন। ঢাকা থেকে মনোনয়নপত্র তোলা ও পরে প্রত্যাহার করে নেওয়া এই সদস্য বলছেন, কাজী ফিরোজ রশীদ নির্বাচনে অংশ দিয়েছেন প্রচুর টাকার বিনিময়ে। তাঁরা চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানাবেন ফিরোজ রশীদের ব্যাংক হিসাব খতিয়ে দেখতে। তাঁরা নিশ্চিত, অস্বাভাবিক গরমিল পাওয়া যাবে লেনদেনের ক্ষেত্রে।
এ প্রসঙ্গে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, রওশন এরশাদ দল টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে শর্তেই তাঁরা কাজ করেছেন।
এদিকে দলের ‘ধরা খাওয়া’ নেতাদের এরশাদের অবস্থান নিয়ে মতদ্বৈধতা আছে। এরশাদের ঘনিষ্ঠ ও সাবেক একজন সাংসদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়া বা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হওয়ার পরও তাঁদের বিশ্বাস, এরশাদ পরিস্থিতির শিকার। সে কারণে এরশাদের ভাই জি এম কাদের নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে পড়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, টিকে থাকতে হলে তাঁকে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আপস করতেই হবে। বিশেষ করে, তাঁর বিরুদ্ধে মঞ্জুর হত্যা মামলা রয়েছে। এটির রায় কী হয়, তা নিয়ে এরশাদ উদ্বিগ্ন। তাঁর পক্ষে খুব বেশি শক্ত অবস্থান নেওয়াও সম্ভব নয়। এ অংশটি রওশন এরশাদের সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ারও বিরুদ্ধে। এঁরা রওশনের বাড়িতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের যাওয়া-আসা নিয়েও ক্ষুব্ধ।
অন্যদিকে আর একটি পক্ষের বক্তব্য, এরশাদের ঘন ঘন মত পরিবর্তন দলের মারাত্মক ক্ষতি করেছে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর আটজন সদস্য কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। চলে গেছেন কেন্দ্রীয় কমিটির অনেক নেতা। তাঁরা মনে করছেন, সংগঠিত হওয়ার একটা সুযোগ জাতীয় পার্টি হেলায় হারিয়েছে।
Thank you for visited me, Have a question ? Contact on : youremail@gmail.com.
Please leave your comment below. Thank you and hope you enjoyed...
0 comments:
Post a Comment