৭০ শতাংশ ভোট আদায়ের নির্দেশ ; ইতিহাসের ব্যয়বহুল নির্বাচন ; ভারত ও ভুটানের ৪ পর্যবেক্ষক ; স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হুমকি বিতর্কিত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ আজ টানা অবরোধ ও হরতাল, বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধ, ভোটারদের অনাগ্রহ, বিদেশী পর্যবক্ষকদের অনুপস্থিতি, পাঁচ শতাধিক মানুষকে হত্যা, ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারারুদ্ধ করে বিতর্কিত ও নজিরবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আজ। ইতিহাসের এক ব্যয়বহুল নির্বাচনে আজ সকাল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভোট। ৪৯ শতাংশ আসনের জন্য ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। বিরোধী দল অংশ না নিলেও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ৭০ শতাংশ এলাকাই ঝুঁকিপূর্ণ। আর ইসির হিসাব অনুযায়ী ১৯ জেলার আসনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের ৫২.২২ শতাংশ ভোটারের ভোটাধিকার হরণ করে ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত ঘোষণা করে গোটা নির্বাচনব্যবস্থাকেই কলঙ্কিত করা হলো। এই নির্বাচন নিয়ে আতঙ্কের এক কালো ছায়া বিরাজ করছে সারা দেশে। আজ ৫৯ জেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশ না নেয়ায় এই নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের কোনো আগ্রহ নেই ভোটারদের। নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থিতার আগেই ১৫৩ জন বিনা ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের ইতিহাসে এক নজির স্থাপিত হয়েছে। ৫২.২২ শতাংশ ভোটার এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বাকি ১৪৭টি আসনেও ভাগবাটোয়ারার নির্বাচন হচ্ছে। আজ নামকাওয়াস্তে ভোট হচ্ছে। যাও স্বতন্ত্র ১০৪ জন প্রার্থী রয়েছে তাদেরকেও বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এই নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে তিন মাস ধরে দেশের প্রধান বিরোধী দলসহ অধিকাংশ দলের চলছে হরতাল ও অবরোধের মতো টানা প্রতিবাদ কর্মসূচি। এতে করে এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক প্রতিবাদী মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আটক রেখেই এই নির্বাচন করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। আর নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত ৪০ দলের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচন বর্জন করেছে। বিদেশী পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এই নির্বাচনে আসছে না। ভারত ও ভুটান থেকে মাত্র দু’জন পর্যবেক্ষক এসেছেন।
দেশের ইতিহাসেও এই ধরনের নির্বাচন এটাই প্রথম। ইতঃপূর্বে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছিল তাতে ৪৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার সে রেকর্ডও ভঙ্গ করল কাজী রকীব উদ্দিনের কমিশন। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে নির্বাচন না হওয়ায় এবার ৫২.২২ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। অথচ এই নির্বাচনে ব্যয় হচ্ছে হিসাব অনুযায়ী অনেক বেশি। ১৪৭টি আসনে ভোট হবে, যেখানে ৪৭ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। ৬৪টি জেলার মধ্যে পাঁচ জেলায় কোনো নির্বাচন হচ্ছে না। ৫৯টি জেলার মধ্যে ১০টি জেলায় সবগুলো আসনে নির্বাচন হচ্ছে। বাকিগুলোতে আংশিক আসনে নির্বাচন হচ্ছে।
নির্বাচনে মহাজোটের শরিক দল অংশ নিলেও সবাই নির্বাচনে নেই। নামকাওয়াস্তে কয়েকটি দলকে নিয়ে আজ আওয়ামী লীগের এই নির্বাচন। এতে ১২টি দল অংশ নিচ্ছে। তা হলো জাপা (এরশাদ), জাসদ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, জেপি, গণফ্রন্ট, ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিএনএফ ও গণতন্ত্রী পার্টি। আর তাদের মধ্যে তিনটি দলের ১০ জনই নিজের দলের প্রতীক ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তারা হলোÑ জাসদ, তরিকত ফেডারেশন, ওয়ার্কার্স পার্টি। তারা আবার নিজের দলের নিবন্ধন ঠিক রাখার জন্য নামকাওয়াস্তে কয়েকটি আসনে দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রার্থী দিয়েছে। আর এবার যে ১৪৭টি আসনে আজ ভোট হচ্ছে তাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ১২০ জন, বাকি ২৭টি আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই।
নির্বাচনী তথ্য : দেশে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪০টি। জাতীয় সংসদের ৩০০ নির্বাচনী আসনে ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ২৯০ জন। ১৪৭টি আসনে ভোটার সংখ্যা হলো চার কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮জন। নির্বাচন পরিচালনাকারী রিটার্নিং অফিসার ৬১ জন, সহকারী রিটার্নিং অফিসার ২৮৭ জন। এ ছাড়া প্রিজাইডিং অফিসার ১৮ হাজার ২০৮ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ৯১ হাজার ২১৩ জন ও পোলিং অফিসারের সংখ্যা এক লাখ ৮২ হাজার ৪২৬ জন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৩৯০ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা হলো ১৮ হাজার ২০৯টি এবং ভোটকক্ষ হলো ৯১ হাজার ২১৩টি।
আগেই ভাগবাটোয়ারা : সরকারি দল আওয়ামী লীগ আগেই ১৫৩টি আসন সমজাতীয় দলের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে। ১৫৩টি আসন ভাগাভাগিতে রয়েছে, আওয়ামী লীগ ১২৭টি, জাপা (এ) ২০টি, জেপি একটি, জাসদ তিনটি ও ওয়ার্কার্স পার্টি দু’টি আসন। আজ ১৪৭টি আসনে ভোট গ্রহণ হচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে ১২০টিতে, জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছে ২৭টি, এরশাদের জাতীয় পার্টির রয়েছে ৬৬টিতে, বিএনএফের ২২টিতে, জাসদের ২১টিতে, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ১৬টিতে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ছয়টিতে, তরিকত ফেডারেশনের তিনটিতে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের দু’টিতে ও একটি করে আসনে রয়েছে গণতন্ত্রী পার্টি, গণফ্রন্ট ও ইসলামি ফ্রন্টের।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : নির্বাচনে ৫০ হাজার সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় কমবেশি এক ব্যাটালিয়ন (৫ থেকে ৮ শ’) সেনাসদস্য ও প্রতিটি উপজেলা বা থানায় দুই থেকে চার প্লাটুন (প্রতি প্লাটুনে ৩৩ জন) সেনাসদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। আর বিজিবি থাকছে ১৬ হাজার ১৮১ জন, র্যাব আট হাজারের অধিক, আনসার ও ভিডিপি দুই লাখ ২০ হাজার, আর্মড পুলিশ ৫০ হাজার ও পুলিশ থাকছে ৮০ হাজারের বেশি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। এখন ৫৯টি জেলার ১৪৭টি আসনে ভোট হচ্ছে। এই আসনের জন্য শুধু নির্বাচনী ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬ কোটি টাকা। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য ব্যয় চাওয়া হয়েছিল ২৮৮ কোটি ৭২ লাখ ৪২ হাজার টাকা। এর বিপরীতে মঞ্জুর করা হয়েছে ১৪৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

0 comments:
Post a Comment