আলুর দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার পেছনের কারণ কী? যাঁরা বলছেন, এবার আলুর উৎপাদন হয়েছে ৮৬ লাখ মেট্রিক টন, তাঁরা কোথায় পেয়েছেন এই উৎপাদনের হিসাব? যত দূর জানি, এখনো পর্যন্ত দেশে আলুর ভরা মৌসুম আসেনি। দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও বেশি আলু আবাদের জেলা মুন্সিগঞ্জের কৃষকেরা এখনো আলু তোলাই শুরু করেননি। অন্যান্য বছর আগাম আলু বাজারে উঠতে শুরু করলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এবার আগাম আলুর দাম এত কম কেন, তা অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
শুরুতেই আসা যাক হিমাগার প্রসঙ্গে। দেশে বর্তমানে আলুর হিমাগারের সংখ্যা চার শতাধিক। এগুলোয় আলুর সংরক্ষণক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ টন। প্রতিবছর অক্টোবর-নভেম্বরে বীজ আলু বের করে দেওয়া হলে সাধারণত হিমাগারগুলো খালি হয়ে যায়। সে হিসাবে এখন সিংহভাগ হিমাগার খালি। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের এক তথ্যে জানা যায়, দেশের ২৮টি হিমাগারে গতবারের আট লাখ ৫৫ হাজার বস্তা আলু এখনো রয়ে গেছে। যে আলুগুলো হিমাগারের মালিক ও কৃষক উভয়ের জন্যই গলার কাঁটা। কৃষক ওই আলু নিতে আগ্রহী হন না। কারণ, তাঁকে বাধ্যতামূলক হিমাগারের বিল পরিশোধ করতে হবে। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ নতুন আলু তোলার স্বার্থেই হিমাগার খালি করার জন্য ওই আলু বের করে ফেলতে বাধ্য হন এর মালিকেরা। সবকিছু বিবেচনায় আলুর বিপুল সরবরাহ ও কৃষকের বাজারমূল্য না পাওয়া নিয়ে অন্যান্য বছর যে সময়ে সংকট দেখা দেয়, এবার তার অনেক আগেই সংকট তৈরি হলো।
সবাই আশা করেছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে আলুর বাজার কৃষকের অনুকূলে যাবে। কিন্তু পরিবহন, সরবরাহ—সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলেও ট্রাকের ভাড়া এখনো রয়েছে বাড়তি, ব্যবসায়ীরাও বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন আগের মতোই।
উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের হিসাবে, এক কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ছয় থেকে সাত টাকা। নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে আমাদের দেশ আলু রপ্তানিতে গেছে। কিন্তু তা বিশ্ববাজারের চাহিদা ও আমাদের সাধ্যের তুলনায় খুবই কম। আমাদের দেশ এখন পর্যন্ত বাইরে রপ্তানি করতে পারছে মাত্র দুই থেকে তিন লাখ টন আলু। চীন, ভারত ও পাকিস্তান আলু রপ্তানিতে ৪০ শতাংশ ইনসেনটিভ দিচ্ছে। আমাদের দেশের রপ্তানিকারকেরা এই ইনসেনটিভের জন্য এখনো সরকারের দ্বারস্থ হয়ে আছেন। অবশ্য আলুর দাম নিয়ে নতুন সংকট দানা বেঁধে উঠতেই কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী আশাব্যঞ্জক একটি সংবাদ দিয়েছেন। তা হচ্ছে, রাশিয়ার ফ্রুট ব্রাদার্স নামের একটি কোম্পানি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ২০ হাজার কনটেইনার আলু আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে। আশা করা যায়, এর মধ্য দিয়ে আলু রপ্তানির একটি ইতিবাচক পথ তৈরি হবে, যার প্রভাব পড়বে আলু চাষ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক—প্রতিটি ক্ষেত্রে।
এবার আসা যাক আমাদের দেশের আলুভিত্তিক শিল্প প্রসঙ্গে। বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে আলুভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তিনটি পটেটো ফ্লেক্স কোম্পানি ও একটি পটেটো স্টার্চ কোম্পানি। এগুলো হচ্ছে মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরে অবস্থিত বিক্রমপুর পটেটো ফ্লেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চাঁদপুরের পাটোয়ারী পটেটো ফ্লেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মুন্সিগঞ্জের বাংলাদেশ পটেটো ফ্লেক্স এবং জয়পুরহাটের তিলকপুরে অবস্থিত ফ্লেমিঙ্গো অ্যাগ্রোটেক নামের পটেটো স্টার্চ কারখানা। একেকটি ফ্লেক্স কোম্পানি প্রতিদিন ১২০ টন আলু প্রক্রিয়াজাত করে। তিনটি কোম্পানি বছরে গ্রহণ করে এক লাখ আট হাজার টন আলু। এর পাশাপাশি জয়পুরহাটের ফ্লেমিঙ্গো অ্যাগ্রোটেক তাদের পটেটো স্টার্চ কারখানা স্থাপনের সময় ঘোষণা করেছিল, তারা বছরে ৬৪ হাজার মেট্রিক টন আলু গ্রহণ করবে। কিন্তু কিছুকাল ওই কারখানা চালু থাকার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যের নিরাপত্তায় আমাদের ইতিবাচক সাফল্য সূচিত হয়েছ উৎপাদন-পূর্ব বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার জো নেই যে উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় চরমভাবেই ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। একদিকে সুষ্ঠু বাজারকাঠামো তৈরির ব্যর্থতা, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজন, সঠিক ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে না পারার কারণেই সূচিত হচ্ছে এই ব্যর্থতা। বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেমন উৎপাদকের হাতে নেই, একইভাবে নেই সরকারের হাতেও। প্রতিবছর সরকারের কিছু খাদ্যনিরাপত্তা ও সহায়তামূলক কর্মসূচি রয়েছে—ভিজিএফ, ভিজিডি ও টেস্ট রিলিফ। এসব কার্যক্রমেও খাদ্যসহায়তা হিসেবে লাখ লাখ কেজি আলুর ব্যবহার হতে পারে।
উল্লেখ্য, দেশে সোয়া তিন কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপন্ন হচ্ছে। খাদ্য মজুতের জন্য রয়েছে মাত্র ১৫ লাখ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গুদাম। কিন্তু সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৮৬ লাখ টন আলু উৎপন্ন হচ্ছে, যার মধ্যে ৫০ লাখ টন সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ৪০০ হিমাগার। বোঝা যায়, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য আলুর বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ হিমাগারের মালিকদের হাতে। ৩৬ হাজার টনের মধ্যে কৃষকের নিজের ব্যবস্থায় বড়জোর কয়েক লাখ টন রাখতে পারেন। বাকি আলুর পুরোটা নিয়েই বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন ব্যবসায়ীরা; যেখানে কৃষক অসহায়। কারণ, কোনো পণ্যই সংরক্ষণের জন্য তাঁর নিজের যেমন ব্যবস্থা নেই, নেই সরকারি ব্যবস্থাও। তাঁকে নির্ভর করতেই হয় বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীর ওপর, যাঁরা সমানভাবে পরিচালনা করেন বাণিজ্য ও রাজনীতি।
আজকের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চাষিদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সরকারের ত্বরিত উদ্যোগ প্রত্যাশা করছি। এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে নিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা স্পষ্টই অভিযোগ করছেন যে একশ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগী আলুর বাজার কৃষকদের প্রতিকূলে নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। এখনই যদি এর লাগাম টেনে না ধরা হয়, তাহলে আলুর ভরা মৌসুমে আরও নেতিবাচক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
শাইখ সিরাজ: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই।
shykhs@gmail.com
0 comments:
Post a Comment