
কথাগুলো বলেন স্বর্ণ ব্যবসায়ী অপহূত মৃদুল চৌধুরীর স্ত্রী শেলী রানী চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহরের পুরাতন টেলিগ্রাফ রোডে ওই ব্যবসায়ীর বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় শেলী রানীর। এ সময় তাঁর উদ্বিগ্ন স্বজনেরা পাশে ছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় বাসা থেকে দোকানে যাওয়ায় সময় র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে একটি দল মৃদুল চৌধরীকে তুলে নিয়ে যায়। এর পর থেকে তাঁর খোঁজ নেই। ব্যবসায়ীর পরিবার চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় অপহরণ মামলা করেছে। অপহরণের সঙ্গে র্যাব-পুলিশ জড়িত বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে র্যাব ও পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
অপহূত ব্যবসায়ীর ভাই শিমুল চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, ‘গত বছরের ৩ অক্টোবর র্যাব-২-এর মেজর রকিবুল আমিন আমার ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানের ৮০ ভরি সোনা কেড়ে নেন। এ ঘটনায় তিনি রকিবুল আমিন, র্যাবের সোর্স ফাহাদ চৌধুরী ও গাড়িচালক বাবুল পালের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলা করেন। মামলা করার কারণে র্যাব আমার ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করছি।’
যোগাযোগ করা হলে মেজর রকিবুল আমিন এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। গতকাল টেলিফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৃদুল চৌধুরী নামের কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ীর লোকজনের কাছ থেকে ৮০ ভরি স্বর্ণ আমি বা র্যাবের কেউ নেইনি। আমি ওনাকে চিনিও না।’
ডিবি পুলিশও মৃদুল চৌধুরী নামের কোনো ব্যবসায়ীকে আটক করেনি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বনজ কুমার মজুমদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁরা তদন্ত করে দেখছেন।
মৃদুলের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারীর মিরেরখিল গ্রামে। পরিবার নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম শহরে ভাড়া থাকেন। চট্টগ্রাম নিউমার্কেটের দ্বিতীয় তলায় একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান আছে তাঁর। এ ছাড়া শহরের হাজারী লেনেও তাঁর একটি পাইকারি সোনার দোকান আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে গলানো সোনার গয়না তৈরির জন্য ঢাকার তাঁতীবাজারে পাঠানো হয়। গত বছরের ৩ অক্টোবর এ রকম ৮০ ভরি গলানো সোনা বেহাত হয়ে যায়।
মৃদুল চৌধুরী নিজে বাদী হয়ে এ ঘটনায় ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করেন। তিনি মামলায় বলেন, গলানো সোনা ট্রেনে করে তাঁর বিশ্বস্ত কর্মচারী ও গাড়িচালক বাবুল পালকে দিয়ে ঢাকায় পাঠান। কমলাপুর রেলস্টেশনে এস আলম কাউন্টারে আসার পর র্যাব-২-এর মেজর রকিবুল আমিন ও তাঁর সোর্স ফাহাদ চৌধুরী জোর করে বাবুলকে গাড়িতে তোলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর বাবুল পালকে নামিয়ে দিয়ে সোনা নিয়ে চলে যান রকিবুল। তিনি এ কথা জানার পর ফোনে মেজর রকিবুল আমিনের কাছ থেকে সোনা ফেরত চান। রকিব তাঁকে বলেন, যাচাই-বাছাই করে সোনাগুলো ফেরত দেওয়া হবে। এরপর তিনি আর সেগুলো ফেরত দেননি। সর্বশেষ ৩ ডিসেম্বর রকিবুল আমিন তাঁকে ফোনে বলেন, ভবিষ্যতে সোনাগুলো ফেরত চাইলে বিপদ হবে। মামলায় গাড়িচালক বাবুলকেও অভিযুক্ত করেন ব্যবসায়ী।
আদালত সূত্র জানায়, মুখ্য মহানগর হাকিম এ ঘটনা তদন্ত করার জন্য সিআইডি পুলিশকে নির্দেশ দেন। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর তদন্ত করছেন। গত ১২ জানুয়ারি সিআইডি পুলিশ র্যাবের মেজর রকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
জানতে চাইলে বিজয় কৃষ্ণ কর প্রথম আলোর কাছে এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সিআইডি বিষয়টির তদন্ত করছে।
মৃদুলের ভাই শিমুল চৌধুরী ওই দিনই প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়। এজাহারে শিমুল চৌধুরী বলেন, ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় বাসা থেকে বের হয়ে হাজারী লেনের দোকানে যাওয়ার পথে কালো রঙের একটি মাইক্রোবাস থেকে তিনজন লোক অতর্কিতে নেমে তাঁর ভাইকে গতিরোধ করেন। তাঁরা জোর করে তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। এ সময় কয়েক গজ দূরে থাকা তাঁদের আত্মীয় ঝুনু সাহা গাড়ির কাছে গিয়ে দেখেন, দুজন অচেনা লোক দুই পাশ থেকে অস্ত্র তাক করে রেখেছে। তিনি জিজ্ঞেস করতেই সিটের বাঁ পাশে থাকা ব্যক্তিটি অস্ত্র উঁচিয়ে নিজেকে র্যাব সদস্য এবং ডান পাশে থাকা ব্যক্তিটি ডিবির সদস্য দাবি করেন। এ সময় ঝুনু চিৎকার করলে গাড়িটি দ্রুত সিনেমা প্যালেসের দিকে চলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী ঝুনু চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দাদাকে (মৃদুল চৌধুরী) জোর করে গাড়িতে তুলতে দেখে চিৎকার দিই। গাড়িতে থাকা সাত-আটজন আমাকে বলেন, তাঁরা ডিবি ও র্যাবের লোক। আমি গাড়ির দরজা খুলতে চাইলে আমার দিকে অস্ত্র তাক করে ধরেন।’
জানতে চাইলে র্যাব-৭-এর পরিচালক লে. কর্নেল মিফতা উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মৃদুল চৌধুরী নামের কোনো সোনা ব্যবসায়ীকে র্যাবের কেউ আটক করেনি। তিনি আত্মগোপন করে আছেন, নাকি র্যাব পরিচয়ে কোনো সন্ত্রাসী তাঁকে অপহরণ করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
র্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই তেল উদ্ধার করে র্যাব। এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মেজর রকিবুল আমিন। এর পর থেকে একটি চক্র তাঁর পেছনে লেগে আছে। সোনা কেড়ে নেওয়া ও ব্যবসায়ী অপহরণের ঘটনাটি সাজানো বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স মালিক সমিতি চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি নুরুল আবছার বলেন, ‘তিন দিনেও অপহূত মৃদুল চৌধুরীর খোঁজ দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল আমরা মানববন্ধন করেছি। প্রশাসনকে গত বুধবার থেকে ৭২ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছি। এর মধ্যে উদ্ধার না হলে আমরা রাস্তায় নামব।’
0 comments:
Post a Comment