Sporty Magazine official website |

‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন’

Sunday, February 23, 2014

Share this history on :
সাক্ষীর নিরাপত্তা
আদালত ও প্রসিকিউশনের কাছে আমি কিছু প্রস্তাব রাখছি। ২০ জানুয়ারি ২০১৪ ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন সিরীয় ‘পক্ষত্যাগকারী’ অনেক-গুলো ফ্ল্যাশ ড্রাইভসহ দেশ ত্যাগ করেছেন। সেগুলোতে ৫৫ হাজারটি ডিজিটাল ইমেজ ছিল। সেগুলো তাঁর ও অন্যান্য সরকারি আলোকচিত্রীর তোলা ১১ হাজার বন্দীর ওপর পরিচালিত অমানুষিক নির্যাতনের ছবি। পরে ওই বন্দীদের সবাইকে হত্যা করা হয়। ওই ব্যক্তি সিরিয়ার মিলিটারি পুলিশের আলোকচিত্রী ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল প্রত্যেক বন্দীর জন্য প্রয়োজনীয় ছবির দলিল প্রস্তুত করা।
সিয়েরা লিয়ন ও সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধের মামলায় জাতিসংঘের প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তিনজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী এই সোর্সকে তিনটি পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁরা তাঁর বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পান। তাঁর বিবরণ ছিল ‘অসম্ভব হূদয়গ্রাহী’। (http://www.theguardian.com /world/2014/jan/20/evidenceindustrial-scale-killing-syria-war-crimes)।
সেই সিরীয় পক্ষত্যাগকারীর সাক্ষ্য নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৩১ পাতার একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনটির এখন সিরীয় সরকারের কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সেই ব্যক্তির সাক্ষ্য রেকর্ড ও নিরীক্ষা করার সময় তাঁর পরিচয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখা হয়।
এই দুই পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্টতই পার্থক্য অনেক। তবে আমার পরামর্শ হচ্ছে, মঞ্জুর হত্যা মামলায়ও আমার সোর্সের পরিচয় গোপন রাখার জন্য একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। এই সোর্স তাঁর চেনা একজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে মঞ্জুরের বন্দিশালায় প্রবেশ করতে দেখেছেন, যিনি তাড়াহুড়ো করে সে কক্ষ ত্যাগ করার আগে মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেনারেল মইনের দৃষ্টিকোণ
জেনারেল মইনের সঙ্গে এ বিষয়টা নিয়ে আমি আলোচনা করি। আমার সোর্সের বিবরণ সম্পর্কে তাঁর মতামত প্রয়োজন ছিল। আমার সোর্সের পরিচয় আমি প্রকাশ করিনি কিংবা কী কারণে সেদিন তিনি ক্যান্টনমেন্টে ঢুকেছিলেন, তাও উল্লেখ করিনি। মইন আমার এ ইচ্ছার তাৎপর্য যথাযথভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। তবে মইন গোপনীয়তা রক্ষা করতে সম্মত হলে, মঞ্জুরকে বন্দী করে রাখা কক্ষটিতে সেদিন যে কথিত সামরিক কর্মকর্তা প্রবেশ করার পর তাঁকে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়, তাঁর নাম আমি তাঁকে জানাই।
এই কর্মকর্তাটি সম্পর্কে আমি মইনের মতামত জানতে চাই। আমি এও জানতে চাই, এরশাদের অজ্ঞাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গিয়ে মঞ্জুরকে হত্যা করা আদৌ সম্ভবপর কি না। মঞ্জুরকে যে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে হত্যা করা হয়েছিল, মইন সেটি জানতেন। তবে পিস্তলের ট্রিগারটা ঠিক কে চেপেছিলেন, সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না।
আমি যে কর্মকর্তার নাম বলেছিলাম, মইন তাঁকে চিনতেন। মইন জানান, সেই কর্মকর্তা, সে সময়ে একজন মেজর জেনারেল ছিলেন, সম্ভবত এরশাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর। তাঁকে নির্বাচন করাটাই ছিল যুক্তিগ্রাহ্য। এই ব্যক্তিকে যদি আমার সোর্স চট্টগ্রামে মঞ্জুরের সেলে প্রবেশ করতে দেখে থাকেন, তাহলে এরশাদ যদি সরাসরি হত্যার নির্দেশ নাও দিয়ে থাকেন, অন্তত তাঁর সবকিছু জানা থাকার কথা।
আমরা উভয়েই এই বিষয়ে একমত হই যে শুধু একটি সফল তদন্ত ও বিচারিক-প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য বেরিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশে কি এটা সম্ভব? 
এসব সাক্ষীসাবুদ খতিয়ে দেখার পর তিন বছর পর ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় জিয়াউদ্দীন চৌধুরীর বই দি অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইট্স্ আফটারম্যাথ। মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক।
জিয়াউদ্দীনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭০ সালে, ঢাকায় আমাদের এক অভিন্ন বন্ধুর বাড়িতে। কিন্তু দিন কয়েক আগে বইটি নিয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করা পর্যন্ত আমাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাঁর বইয়ে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের ওপর যে অধ্যায়টি আছে, সেটি আমার ও মইনের সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়; সেটি আমাদের গবেষণাকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, মঞ্জুরের বিয়োগান্ত হত্যাকাণ্ড বিষয়ে যে তথ্যাদি আমাদের হাতে রয়েছে, সেসবের সঙ্গে জিয়াউদ্দীনের কথা খাপ খেয়ে যায়। যদিও তাঁর আর আমার সোর্স কিন্তু ভিন্ন। ফলে একই ঘটনার ওপর আমরা দুজন ভিন্ন ব্যক্তির বিবরণ পেলাম।
জিয়াউদ্দীন চৌধুরীর ভাষ্য হলো:
‘সামরিক বাহিনীর সেই ডাক্তারের কাছ থেকে আমি মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাবলি সম্পর্কে জানতে পাই, যিনি দিন দুয়েক আগে জিয়ার মৃতদেহ প্রস্তুত করেছেন। মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই চিকিৎসকই দাফনের আগে মঞ্জুরের মৃতদেহ প্রস্তুত (ক্ষতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া) করেছেন।
‘মঞ্জুরকে ক্যান্টনমেন্টে নেওয়ার পর একজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা (ব্রিগেডিয়ার) সেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেই কর্মকর্তার একটিই উদ্দেশ্য ছিল, মঞ্জুরকে খতম করা। তাঁকে নাকি ঢাকা থেকে পাঠানো হয়েছিল। কর্তব্যরত সেনা-কর্মকর্তাকে তিনি বলেন, মঞ্জুরকে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য এসেছেন। এরপর তিনি সেলে প্রবেশ করেন, পিস্তল বের করে মঞ্জুরকে গুলি করেন, তারপর বেরিয়ে আসেন। সবকিছু পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী। মঞ্জুরকে আমি চিনতাম। তাঁর মতো বুদ্ধিমান, ঠান্ডা মাথা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এ রকম হীন ষড়যন্ত্র করা সম্ভব বলে আমার মনে হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, মৃতেরা কথা বলতে পারে না। মঞ্জুরের কথা শোনার জন্যও আমরা তাঁকে আর পাব না।’
এই অনুচ্ছেদগুলো পড়ার পর আমি জিয়াউদ্দীন চৌধুরীকে ফোন করি। আমরা কিছুক্ষণ কথা বলি। আমি জানতে চাই, তাঁর সোর্স সুনিশ্চিত কি না যে সেই কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার ছিলেন, নাকি মেজর জেনারেল—মইনকে নামটা বলার পর যেমনটা তিনি বলেছিলেন (জিয়াকে আমি সেই কর্মকর্তার নামটা বলিনি)। জিয়াউদ্দীন বলেন, সামরিক ডাক্তার সেই ব্যক্তির নাম ও পদবি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন কি না, সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। ডাক্তার ভদ্রলোক শুধু জানতেন, ঢাকা থেকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে সেনা হেফাজতে থাকা জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন।
জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে কে বা কারা কেন হত্যা করেছে, আলাদা আলাদাভাবে কাজ করলেও চারজন ব্যক্তি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন বলে আমি মনে করি। যদিও শেষ পর্যায়ের কাজে এসে তাঁদের মধ্যে যোগ ঘটেছে। এই চার ব্যক্তি হচ্ছেন মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সময় যিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল ছিলেন; চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন চৌধুরী; আমার সেই বিশ্বস্ত সোর্স যিনি দাবি করেন, ঢাকা থেকে তাঁর পরিচিত এক ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে এসে মঞ্জুরের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তার কিছুক্ষণ পরই মঞ্জুরের মৃত্যু হয়; আর ১৯৮১ সালে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের খবর সংগ্রহ করা একমাত্র বিদেশি সাংবাদিক, আমি।
চাক্ষুষ সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের পরও এখন পর্যন্ত আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে পারিনি কিংবা এ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো প্রতিষ্ঠান কলকাঠি নেড়েছে কি না, তাও স্পষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। এবার আমরা অন্তত এমন একটি শক্ত ভিত্তি প্রস্তুত করতে পেরেছি, যার ওপর এই মামলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ফৌজদারি তদন্ত সম্পন্ন হতে পারে। গত ৩০ বছরে তো এই মামলার জন্য এ রকম কোনো তদন্তও হয়নি।
সদরউদ্দীনের সাক্ষ্য: ‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন’
এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন জেনারেল এরশাদকে বললেন, ‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন। এটা কিন্তু ভালো করলেন না।’ ২ জুন ১৯৮১
এই লেখাটি ছাপাখানায় যাওয়ার আগে আগে প্রথম আলোর এক কর্মী আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথির সন্ধান দেন। সেটি হচ্ছে এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীনের ভাষ্য। সিআইডির একদল তদন্ত কর্মকর্তার সামনে তিনি এ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
তিনি এ সাক্ষ্য দেন ১৯৯৫ সালের ২৫ মার্চ। মঞ্জুরের বড় ভাই আবুল মনসুর জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে তাঁর ভাইকে হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করায় তাঁর এই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। তিনি এতে বলেন, ২ জুন ১৯৮১ মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ডের খবর শুনে এরশাদের মুখোমুখি হয়ে কীভাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন। এটা কিন্তু ভালো করলেন না।’ হত্যার কিছু সময় আগেই মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে সেনা-হেফাজতে নিয়ে নেওয়া হয়।
এয়ার মার্শাল সদরউদ্দীন ও পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল এ বি এম জি কিবরিয়ার মনে এই শঙ্কা ছিল যে মঞ্জুর খুন হতে পারেন। মঞ্জুরের খুনের এক দিন আগে, ১ জুন ১৯৮১, তাঁরা উভয়েই রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে বলেন, মঞ্জুরকে সেনা-হেফাজতে নিয়ে আসার জন্য এরশাদ যে দাবিটি করছেন, তা যেন তিনি মেনে না নেন। মঞ্জুর চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
সদরউদ্দীন ও কিবরিয়া মঞ্জুরকে নিরাপদে পুলিশের হেফাজতে রাখার জন্য সাত্তারের কাছে আবেদন করেন। সেনাবাহিনী হাটহাজারী থানায় অবস্থান নিয়ে মঞ্জুরকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে তাঁদের মনে এই ভয় ছিল যে সাত্তার এরশাদের আবেদনে সাড়া দিলে মঞ্জুরের বিপদ ঘটবে।
এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীন ১৯৮১ সালের বসন্ত পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বছর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর সাক্ষ্যে দেখা যায়, তিনি কীভাবে জিয়ার নিয়তিনির্ধারক যাত্রার সময় চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে যান জিয়াকে বরণ করার জন্য। এরপর ২৯ মে যশোরের উদ্দেশে চট্টগ্রাম ত্যাগ করার আগে সেখানকার বিমানঘাঁটি পরিদর্শন করেন।
পরদিন, ৩০ মে ১৯৮১, সকাল সাতটায় এরশাদ সদরউদ্দীনকে ফোন করে জানান যে জিয়া গত রাতে চট্টগ্রামে খুন হয়েছেন। এরশাদ তাঁকে অনতিবিলম্বে ঢাকায় আসতে বলেন। তিনি ঢাকায় পৌঁছান তিন ঘণ্টা পর। 
সদরউদ্দীন তাঁর সাক্ষ্যে শুধু উত্তম বিচারবোধেরই পরিচয় দেননি, সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যকার চলমান মরণপণ দ্বন্দ্বের ব্যাপারেও সজাগ ছিলেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন, কী ঘটে চলেছে। তিনি একজন বুদ্ধিদীপ্ত লোক ছিলেন, বোকা ছিলেন না।
জেনারেল এরশাদ ও অন্যদের সঙ্গে ৩০ মে ও ১ জুন তাঁর সাক্ষাতের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে এটা স্পষ্ট যে সত্যিকার অভ্যুত্থানটি চট্টগ্রামে ঘটেনি, ঘটেছে ঢাকায়। যশোর থেকে ফিরে তিনি সরাসরি জেনারেল এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন। 
সদরউদ্দীন তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন:
‘[৩০ মে ১৯৮১] আমি তাঁর অফিসে গিয়ে বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন আর্মি অফিসারকে দেখি। তাঁদের মধ্যে মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী, মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, মেজর জেনারেল মান্নাফ, মেজর জেনারেল নূরউদ্দীনসহ অন্যান্য আরও কিছু আর্মি অফিসারকে দেখি। সেখানে তাঁরা চিটাগাংয়ে প্রেসিডেন্ট নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। জেনারেল এরশাদ আমাকে ঘটনা দ্রুত জানালেন। আমি সেখানে আনুমানিক ২০ মিনিট ছিলাম। সেখান থেকে বের হয়ে আসার পথে মেজর জেনারেল শওকত ও মেজর জেনারেল মইন আমার পেছনে পেছনে আসেন। আসার পথে করিডরে তাঁরা আমাকে বলেন যে এখানে মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে ফাঁসানোর একটা পরিকল্পনা চলছে। মেজর জেনারেল শওকত আরও বলেন, আমার মনে হয় না মঞ্জুর এটা করতে পারে (আই ডোন্ট থিংক মঞ্জুর কুড হ্যাভ ডান ইট।)’ এর উত্তরে আমি কিছুই বলিনি।...
‘১ জুন ১৯৮১ তারিখ বিকেল আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার সময় আমি বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির অফিসে ছিলাম। তখন সেখানে লে. জেনারেল এরশাদও ছিলেন। আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এই সময় টেলিফোন আসে। প্রেসিডেন্ট টেলিফোনে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট টেলিফোন রেখে জানান, আইজিপি কিবরিয়া জানিয়েছেন যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং অন্যরা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।
‘সংবাদটি বলার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে জেনারেল এরশাদ উত্তেজিত অবস্থায় চেয়ার থেকে উঠে পড়েন। আর কিছু না বলে সরাসরি প্রেসিডেন্টের পাশে রেড টেলিফোনের কাছে যান এবং একটি নম্বরে ডায়াল করেন। টেলিফোনে তাঁর যে কথাটি শুনতে পেলাম তা হলো, ‘মঞ্জুরকে পুলিশ আটক করেছে। এক্ষুনি তাঁকে নিয়ে নেওয়া উচিত। তারপর সেই পরিকল্পনামতো এগোও (‘মঞ্জুর হ্যাজ বিন ক্যাপচার্ড্ বাই দ্য পুলিশ। হি শুড বি ইমিডিয়েটলি টেইকেন ওভার অ্যান্ড ক্যারি আউট দ্যাট প্ল্যান।)’ বলেই তিনি টেলিফোন রেখে দেন। তখন আমি বলি, ‘জেনারেল এরশাদ, আপনি কোন পরিকল্পনার কথা বলছেন, আমি কি জানতে পারি (হোয়াট ইজ দ্যাট প্ল্যান ইউ আর টকিং অ্যাবাউট, মে উই নো)?’ এতে তিনি আবার বেশ উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘এয়ার চিফ, আপনি কিছুই বোঝেন না।’ আমি বলি, ‘আমি কী বুঝি না-বুঝি, আপনার কাছ থেকে জানতে হবে না (আই ডোন্ট হ্যাভ টু নো ফ্রম ইউ)।’ পরে আমি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলি, ‘স্যার, দয়া করে নিশ্চিত করুন যাতে মঞ্জুরের কিছু না হয় আর তিনি ন্যায্যবিচার পান। মঞ্জুরের কিছু হলে জাতির কাছে আপনাকে জবাব দিতে হবে (প্লিজ মেইক শিওর দ্যাট নাথিং হ্যাপেনস টু মঞ্জুর অ্যান্ড হি ইজ গিভেন আ ট্রায়াল। ইফ অ্যানিথিং হ্যাপেনস টু মঞ্জুর, ইউ উইল বি অ্যানসারেবল টু দ্য নেশন।)’ এর উত্তরে সাত্তার সাহেব বিচার করা হবে বলে জানান।
‘সন্ধ্যার পর আইজিপি কিবরিয়া অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের অফিসে আসেন। আসার পরপর আর্মি চিফের সঙ্গে জেনারেল মঞ্জুরসহ গ্রেপ্তারকৃত অন্যদের সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে বাদানুবাদ হয়। আইজিপি কিবরিয়া সাহেব বারবারই গ্রেপ্তারকৃতদের বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে রাখার বিষয়ে চাপ দিচ্ছিলেন। অন্যদিকে জেনারেল এরশাদ গ্রেপ্তারকৃতদের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের চাপ দিচ্ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ বাদানুবাদের পর আর্মি চিফের পরামর্শে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং গ্রেপ্তারকৃত অন্যদের সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত দেন। এর পরপরই আর্মি চিফ কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যান এবং ফেরত আসেন। এরপর আমি চলে আসি।
‘২ জুন ১৯৮১ তারিখ ভোররাত্রি আনুমানিক দেড়টা-দুইটার দিকে উইং কমান্ডার কামাল, ডিরেক্টর, এয়ার ইন্টেলিজেন্স, টেলিফোনে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের হত্যার খবর দেন। আমি সকাল আনুমানিক ছয়টা-সাতটার সময় এরশাদ সাহেবকে টেলিফোনে বলি, এরশাদ সাহেব, আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন। এটা কিন্তু ভালো করলেন না।’
(টীকা: বাংলা শ্রুতিলিখনে এরশাদের উত্তর ঠিক পরিষ্কার নয়। এতে কিছু ইংরেজি শব্দ আছে, যার অর্থ অস্পষ্ট। মনে হচ্ছে, এরশাদ বলছিলেন, ‘কিছু সৈন্য...মঞ্জুরকে হত্যা করেছে।’ সদরউদ্দীনের উত্তর অবশ্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ‘আমি একটু অবিশ্বাসের সুরে বললাম, অন্য কাউকে বলেন, আমাকে বিশ্বাস করতে বলবেন না।’)
এয়ার ভাইস মার্শাল সদরউদ্দীনের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যটিতে ছয়টা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ রকম:
১. সদরউদ্দীন ঢাকায় আসার পর মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী ও মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তাঁকে বলেন, জিয়া হত্যায় ‘মঞ্জুরকে ফাঁসানোর একটা পরিকল্পনা চলছে’।
Thank you for visited me, Have a question ? Contact on : youremail@gmail.com.
Please leave your comment below. Thank you and hope you enjoyed...

0 comments:

Post a Comment