
২০০৭ সালে ব্যাংক লুটের হোতা সোহেলের সঙ্গে বিয়ে হয় মাহিমা (২৫) এর। মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্র ধরে দুজনের এ বিয়ের বিষয়টি জানতো না মাহিমার পরিবার। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পরই সোহেলের প্রেমের ফাঁদে আটকা পড়ে সে। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই পরিবারের কাছে একের পর এক বিয়ের প্রস্তাব আসতে থাকে মাহিমার জন্য। কিন্তু বিয়েতে মত পাওয়া যেত না তার। গোপন বিয়ের বিষয়টি সব সময় কৌশলে এড়িয়ে গেলেও এক সময় ধরা পড়ে। পরিবারকে জানান, হাবীব নামের এক তরুণের সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গেছে। মাহিমার সুখের কথা ভেবে পরিবারের লোকজনও মেনে নেন তাদের বিয়ে।
মাহিমার ভবিষ্যৎ সুখের আশায় চেষ্টা-তদবির আর সহযোগিতার মাধ্যমে পারিবারিক উদ্যোগে সোহেলকে পাঠানো হয় দুবাই। কিন্তু সুখ অধরাই থেকে যায় মাহিমার জীবনে। স্বামী দুবাই থেকে কিছু টাকা জমিয়ে দেশে ফিরলেও সেটি কিছুদিনেই শেষ হয়ে যায়। প্রকট দরিদ্রতার জন্য বিবাহিত জীবনের সাত বছরেও তারা চিন্তা করতে পারেনি সন্তান নেওয়ার কথা। কিন্তু মাহিমার কাছে বরাবরই অজানা ছিল হাবীব পরিচয়ের আড়ালে ইউসুফ মুন্সীর প্রথম বিয়ে এবং সন্তান থাকার বিষয়টি।
প্রথম বিয়ের মতোই স্ত্রী মাহিমার কাছে ব্যাংক লুটের পরিকল্পনার কথাও গোপন রেখেছিল সোহেল। ব্যাংক লুটের ২ সপ্তাহ আগে স্বামীর দুর্ধর্ষ পরিকল্পনার কথা প্রথম জানতে পারে মাহিমা। সোহেল তাকে জানায়, ব্যাংক থেকে চুরি করা টাকা নিয়ে দুজনে মিলে ঢাকায় গিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে। স্বচ্ছলতার স্বপ্নে বিভোর দারিদ্র্যক্লিষ্ট মাহিমা ঘটনার ৭/৮ দিন আগে পাকুন্দিয়ার চিলাকাড়া গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ঢাকায় যাওয়ার বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েও আসে। তখনও তার পরিবারের লোকজন জানতো না, কি এক ভয়ংকর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে হাবীব ওরফে সোহেল।
শনিবার বিকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সোহেলের স্ত্রী মাহিমা আটক হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে সে এসব তথ্য দিয়েছে। এদিকে ব্যাংক থেকে লুট করা টাকা ৫টি বস্তায় ভরে ২৩০ বস্তা চালের নিচে লুকিয়ে যে ট্রাকে করে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার শ্যামপুরে গিয়েছিল সোহেল, সেটি আটক করেছে পুলিশ। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়ি উপজেলার তেলোয়াড়ি মাদ্রাসা মাঠ থেকে ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো ট-১৬-৮৪৬৮) আটক করা হয়। এ সময় ট্রাকটির হেলপার আলমগীর (৩০) পুলিশের হাতে আটক হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর মডেল থানার ওসি মো. আবদুল মালেক ট্রাকটি আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ২২২ বস্তা চাল যে কাভার্ড ভ্যানে করে সোহেল রাজধানীর শ্যামপুর থেকে আটরশির দরবার শরীফে পাঠিয়েছিল সেটিকেও আটক করে পুলিশ। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে চালক আবদুস সাত্তার (৬৫) ও হেলপার সেলামত (৫৫) সহ কাভার্ড ভ্যানটি (ঢাকা মেট্রো ট-১৬-৯৪৩০) আটক করা হয়।
অন্যদিকে ব্যাংক লুটের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যাংকের এমএলএসএস আবুবকর সিদ্দিকের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তদন্ত কর্মকর্তা ৭ দিনের রিমান্ডের জন্য আবেদন করেছিলেন। গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জের ১ নম্বর আমল গ্রহণকারী আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. হামিদুল ইসলাম শুনানি শেষে আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তিন দিনের রিমান্ড আদেশ দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাহিমা স্বামীকে নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের নগুয়া এলাকার ইসহাক মিয়ার বাসায় ভাড়া থাকতো। সেখানে সে হাবীব নামে পরিচিত ছিল। সোহেল গ্রেপ্তার হওয়ার আগে হঠাৎ করে সে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা জালে আটকা পড়ে মাহিমাও। স্বামী সোহেল এবং মা মিনা আক্তারকে নিয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে শনিবার বিকালে কৌশলে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় ডেকে এনে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে রাতে কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসা হয়।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে মাহিমা জানায়, সে বর্তমানে শহরের একটি কলেজে স্নাতক তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় ২০০৭ সালে সোহেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। স্বামী হাবীবের ব্যাংক লুটের পরিকল্পনার বিষয়টি শুরুতে সে জানতো না। পুলিশ জানায়, মাহিমা শান্ত ও পরহেজগার প্রকৃতির মেয়ে। সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতো। তার পিতা হেলাল উদ্দিন সম্পর্কেও তেমন খারাপ কিছু পাওয়া যায়নি।
0 comments:
Post a Comment