
ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি না থাকলেও ঘোষণার সময় অস্বাভাবিকভাবে পাল্টে যেতে থাকে ভোটের ফলাফল। নিয়ম রক্ষার ওই নির্বাচনে ১৪৭টি আসনের ১৮ হাজার ২০৪টি কেন্দ্রের মধ্যে একেবারেই ভোটারশূন্য ছিল বহুসংখ্যক কেন্দ্র। সরকার বিরোধী জোটের প্রতিরোধের মুখে স্থগিত হয়ে যায় ৫৩১টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ। নির্বাচনের দিন রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও ভোটার উপস্থিতি কম থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ’৭০ এর নির্বাচনসহ অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে আনুপাতিক হারে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল; এটি স্বীকার করছি।
নির্বাচন প্রত্যক্ষ করে গতকালই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ স্বীকার করেন ভোটারদের উপস্থিতি কম। ভোটার কম হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দল যেহেতু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না তাই ভোটারদের উপস্থিতি কম। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোও এই নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কম দেখিয়ে তা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসেবে উল্লেখ করে। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে নির্বাচনে ১০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানায়। অপরদিকে ভোটার উপস্থিতি ১০ শতাংশেরও কম ছিল বলে দাবি করেছে পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং এলায়েন্স (ফেমা)। বাংলাদেশের একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অদ্ভূত নির্বাচন’ বলে মন্তব্য করেছে বিশ্বখ্যাত মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, কম ভোট পড়ার হিসেবে এটি বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে। পশ্চিম বাংলার প্রভাবশালী বাংলা আনন্দবাজার পত্রিকা বলেছে বাংলাদেশের নির্বাচনে মানুষের বড় একটা অংশ ভোটের লাইনে দাঁড়াতে উৎসাহ বোধ করেনি। বিবিসি বাংলাদেশের নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন বলে উল্লেখ করেছে। তবে নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি নিয়ে সরকারের দালালি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে ইলেকশন ওর্য়াকিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) নামের সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলন ডেকে কোন বিষয়ে প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলেও নির্বাচনে ৩০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে দাবি করেন। দশম জাতীয় নির্বাচনে আংশিক পর্যবেক্ষণ করা এই সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে বিব্রত অবস্থায় অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। এসময় সাংবাদিকরা কেউ কেউ বলেন, আপনারা কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না। বরং সরকারের পক্ষে দালালি করছেন। এ সময় নির্বাচনে ৩০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হয় ইডব্লিউজি এর পক্ষ থেকে।
৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, ঢাকা-১৮ আসনের উত্তরার নবাব হাবিবউল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে আড়াই ঘণ্টায় ভোট পড়ে মাত্র ১৪টি। এখানে ছয় বুথের তিনটিতে কোনো ভোটই পড়েনি। তিন কেন্দ্রে মোট ভোট সাড়ে ৮ হাজার। উত্তরা রাজউক মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রথম দেড় ঘণ্টায় মাত্র ৫টি ভোট পড়ে। সব মিলিয়ে ভোটার আট হাজারেরও বেশি। দায়িত্বরত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার জানান, সাড়ে নয়টা পর্যন্ত এ কেন্দ্রে মাত্র পাঁচজন ভোটার ভোট প্রয়োগ করেছেন। ভোট কেন্দ্রের বাইরে ভোটারের উপস্থিতি খুবই কম।
শ্যামপুরের দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢাকা-৫ আসনের দুটি নির্বাচনী কেন্দ্রে সাড়ে নয়টার মধ্যেই ৫৫ জন ভোটার ভোট দেন। ভোট শুরুর প্রথম ঘণ্টায় বেশির ভাগ কেন্দ্রে ভোটারের কোনো উপস্থিতিই ছিল না। সকাল নয়টার পর থেকে বিভিন্ন প্রার্থীর তৎপরতায় তাঁদের কর্মীরা ভোটার হাজির করতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। দক্ষিণখানের কাওলায় সিভিল এভিয়েশন উচ্চবিদ্যালয়ে স্থাপিত তিনটি কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন সাহারা খাতুন। ভোটার নেই দেখে দলীয় কর্মীদের ফোন দেন। একই আসনে যাত্রাবাড়ীর শহীদ জিয়া স্মৃতি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টায় মাত্র ৯ জন ভোটার ভোট দেন। একই অবস্থা দেখা যায় এই আসনের অন্যান্য কেন্দ্রগুলোতেও। দুপুর ২টা পর্যন্ত এই আসনের কেন্দ্রগুলোতে ভোট পড়ে মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ। দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে দুটি কেন্দ্রে সকাল ১০টা পর্যন্ত ৬৩টি ভোট পড়ে। এই দুটি কেন্দ্রে মোট ভোটার চার হাজার ৪৯৮ জন। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ১০ হাজার ৩৬২। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার সময় এই আসনে ভোট দেখানো হয়, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিবুর রহমান মোল্লা পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৬৬৬ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থী আরজু শাহ সায়েদাবাদী পেয়েছেন ২ হাজার ৪৩৭ ভোট। ঢাকা-৬ আসনে কবি নজরুল সরকারি কলেজে প্রথম ভোটটি পড়ে আটটা ৫৫ মিনিটে। নয়টা ১০ মিনিট পর্যন্ত এই কেন্দ্রে চারজন ভোট দেয় বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার এসএম শাহনেওয়াজ। একই আসনের বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুলে দুটি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট নারী ভোটার দুই হাজার ৩৪৮ ও পুরুষ ভোটার দুই হাজার ৫৫১ জন। এই কেন্দ্রেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট তিনটি কেন্দ্র ছিল। এর মধ্যে কেন্দ্র-১-এর মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৫২ জন। সকাল সাড়ে ১০ পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ভোট পড়েছে মোট ২৯টি। কেন্দ্র-২-এর মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ৪৬৫ জন। ভোট পড়েছে মোট ২৯টি। কেন্দ্র-৩-এর ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৬৫৯টি ভোট এর মধ্যে ভোট পড়ে ৫৭টি। ঘোষিত ফলে এই আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী কাজী ফিরোজ রশীদ। ফিরোজ রশীদ লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৯১ ভোট। ৭ হাজার ২৫৯ ভোট পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ সাইদুর রহমান সহিদ।
বগুড়া-৪ আসনের কাহালু উপজেলার তাইরুন্নেছা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ভোট কেন্দ্রে সকাল আটটা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার ঘণ্টায় ভোট পড়ে মাত্র ৭১টি। এর এক ঘণ্টা পর পরে আরও নয়টি। ৮টা থেকে ২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৯৯টি। আর সব শেষে বিকাল ৪টায় এর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১৪২টি ভোট। ওই কেন্দ্রে ভোট ছিল চার হাজার ৩২০ জন। নন্দীগ্রাম উপজেলার নিমাইদীঘি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৩০৮। গতকাল সারাদিনই ভোট পড়ে মাত্র ৩২টি। কুমিরা প-িতপুকুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ২৬০। দিনশেষে ভোট পড়েছে মাত্র ২৫৮টি। অথচ নির্বাচনের ফলাফলে দেখানো হয় ওই আসনে জাসদের রেজাউল করিম তানসেন ২২ হাজার ২০৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির নুরুল আমিন বাচ্চু পেয়েছেন ১৩ হাজার ৪৮৯ ভোট।
নওগাঁ-৩ আসনে বদলগাছী উপজেলার খাদাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ৮০০। বেলা ১১টা পাঁচ মিনিট পর্যন্ত আনুমানিক ৯০টি ভোট পড়ে। একইভাবে অনান্য কেন্দ্রগুলোতেও দেখা যায় দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোটারদের সংখ্যা অনেক কম। দুই ঘণ্টা বাকি থাকতে সেখানের প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট পড়ে গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। অথচ ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিম ৭৪ হাজার ৪০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী ড. আকরাম হোসেন চৌধুরী পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৮৬৩ ভোট।
নাটোর-৩ আসনের সিংড়ার মাঝগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ২ হাজার ৬২৭ জন ভোটার। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সেখানে ভোট দেন ২৭ জন। শেরকোল সমজান উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল তিন হাজার ২৮৭ জন। সকাল পৌনে ১০টা পর্যন্ত ১৫২ জন ভোট দেন। চলনবিল মহিলা ডিগ্রি কলেজ ভোটকেন্দ্রে দুই হাজার পাঁচজন ভোটারের মধ্যে সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ভোট দেয় ৩৩৬ জন। কিন্তু ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায় বিপুল সংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হকের (চুন্নু) বাড়ির কাছে তাড়াইল উপজেলার কাজলা গ্রামে মুজিবুল হকের বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে কাজলা আলিম মাদরাসা ও কাজলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র। কাজলা আলিম মাদরাসা কেন্দ্রে ভোটার দুই হাজার ১১৯। বেলা একটার মধ্যে সেখানে এক হাজার ৮০০ ভোট পড়ে। কাজলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন হাজার ৫৫৯ ভোটের মধ্যে বেলা একটা ১০ মিনিট পর্যন্ত দুই হাজার ৩০০ ভোট পড়ে। অথচ জাফরাবাদ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত দুই হাজার ৪০ ভোটের মধ্যে পড়ে ৮১টি। নিয়ামতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেলা একটা পর্যন্ত দুই হাজার ৫১৭ ভোটের মধ্যে ২০৯ ভোট এবং নোয়াবাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন হাজার ৩০২ ভোটের মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পড়ে ৪২৭ ভোট।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে ভোটের আগের দিন সাতটি ভোটকেন্দ্রে হামলা-অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং ভোটের দিনেও সকাল থেকেই থেমে থেমে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আগুন দেওয়া হয় নির্বাচনের সরঞ্জামবাহী দুটি গাড়ি ও তিনটি বাড়ির খড়ের গাদায়। এই ঘটনার ফলে সকাল থেকেই ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটার শূন্য ছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কয়েকজন বেলা ১১টার পর ভোট কেন্দ্রে আসলেও সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। বিশেষ করে সারাদিন নারী ভোটারদের কোন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। তবে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর রাতে নির্বাচনী অফিস থেকে জানানো হয়, এই আসনে মোট দুই লাখ ৬৬ হাজার ৭১৯ ভোটের মধ্যে এক লাখ ১৪ হাজার ৪১৯ ভোট পড়েছে যা মোট ভোটের ৪২ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর মধ্যে রামগতিতে এক লাখ ৪২ হাজার ৪৬২ ভোটের মধ্যে ৭৭ হাজার ৩৪৭ ভোট পড়েছে। আর কমলনগরে মোট এক লাখ ২৪ হাজার ২৫৭ ভোটের মধ্যে ৩৭ হাজার ৭২টি ভোট পড়েছে। নৌকার প্রার্থী এক লাখ ৫ হাজার ৫৮১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজধানীর গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচটি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৩ শতাংশ। এসব কেন্দ্রে মোট ১১ হাজার ৬৮৯ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৭৬ জন। ওই এলাকার ৬১ নম্বর কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন মোট ২ হাজার ৯৫ জন। ভোট পড়েছে ১২২টি। ৬২ নম্বর কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ২ হাজার ৮২ জন, ভোট পড়েছে ৬৯টি। ৬৩ নম্বর কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ২ হাজার ৪০২ জন, ভোট পড়েছে ২৭টি। ৬৪ নম্বর কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ২ হাজার ৪১০ জন, ভোট পড়েছে ২০টি এবং ৬৫ নম্বর কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ২ হাজার ৩০১ জন, ভোট পড়েছে ১৩৬টি। ঘোষিত ফলে দেখা যায়, বিএনএফ প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ ৪৩ হাজার ৫৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রার্থী এমএ হান্নান মৃধা ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৪৬।
চট্টগ্রাম-১১ আসনে তিন ঘণ্টায় ভোট পড়ে মাত্র একটি। ওই আসনে মোট ভোটার ছিল চার হাজার ৪২৭টি, সেখানে বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়ে মাত্র একটি। দক্ষিণ হালিশহর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো. মহসিন এ তথ্য জানান। একই চিত্র দেখা গেছে গ্রীণ ভিউ মডেল হাইস্কুলে। ওই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল চার হাজার ৭৬৬ জন। বেলা ১১টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রেও ভোট পড়ে মাত্র একটি। চট্টগ্রাম-৯ আসনেও ভোট শুরুর পর প্রথম তিন-চার ঘণ্টায় ভোট পড়ে একটি বা দুটি।
ঢাকা-১৫ আসনে (মিরপুর-কাফরুল) কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কিছুসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে এসেছেন। কাফরুলের হাজী আশরাফ আলী হাইস্কুলে মোট সাতটি কেন্দ্র। সকাল আটটা ৪০ মিনিটে ৭৩ নম্বর কেন্দ্রে গিয়ে একজন ভোটারও দেখা যায়নি। একই স্কুলের ৭৪ নম্বর কেন্দ্রে পৌনে নয়টায় একজন ভোটারও দেখা যায়নি। তবে নয়টার দিকে ৬৯ নম্বর কেন্দ্রে কয়েকজন ভোটার এসেছেন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার। সকাল সোয়া আটটায় মধ্য পীরেরবাগের ফুলকি নার্সারি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, পুরো চত্বর ফাঁকা। সেখানে মাত্র একটি ভোট পড়েছে। বেলা ১০টা ৫০ মিনিটে মিরপুরের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের একটি কেন্দ্রে (৪৭ নম্বর কেন্দ্র) গিয়ে দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতি একেবারেই হাতেগোনা। কেন্দ্রটির প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জানান, তাঁর কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা তিন হাজার ১৯। ওই কেন্দ্রের পাঁচটি বুথে ভোট নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ৫ নম্বর বুথে মাত্র একটি ভোট পড়েছে। বাকি চারটিতেও দু’একটি করে ভোট পড়েছে। এর আগে সকাল ১০টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও প্রায় একই চিত্র। ওই বিদ্যালয়ে ৮৮ নম্বর কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে মোট ভোটার সংখ্যা দুই হাজার ৫৮৯ জন। তবে তখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র ২৫টি ভোট পড়েছে। একই চিত্র কাফরুলের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শাখা-৩-এ।
রংপুরের পীরগঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনে আওয়ামী লীগের যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভোট কেন্দ্র দখল করে নিজেরাই সিল মারে। ফলে বেলা ১টায় ৩ শতাংশ ভোট কাস্টিং হলেও বিকেল ৪টায় হয়ে যায় ৭০ ভাগের ওপরে। পীরগঞ্জের ধুলগাড়ি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার শহিদুল ইসলাম সেবু মন্ডল জানান, তার কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল দুই হাজার তিনশ’। বেলা ১টা পর্যন্ত ভোট পড়েছিল মাত্র ৮৫টি। কিন্তু ১টার পরপরই রংপুর ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আমাদের সবাইকে জিম্মি করে নিজেরাই টেবিলে বসে সিল মারা শুরু করে। মুহূর্তেই ভোট কাস্ট হয়ে যায় ৭৭ ভাগ। আমি নিজে তাতে সই করতে না চাইলেও চাকরি যাওয়ার ভয় দেখিয়ে সই নিয়েছে তারা। তিনি আরো বলেন, একই অবস্থা ছিল পীরগঞ্জের প্রত্যেকটি ভোটকেন্দ্রে। দিন শেষে ফলাফলে দেখা যায়, ওই আসনে শেখ হাসিনা ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৯৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় পার্টির নূর-এ আল যাদু ভোট পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৫৯।
কুমিল্লা-৮ আসনের নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। এখানে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪ ভোটের মধ্যে ৬৭ হাজার ৯২০ ভোট পড়ে। এতে ২৭ শতাংশ ভোট পড়ে। যার মধ্যে সোনাইমুড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ২ হাজার ৯২৩ এর মধ্যে ভোট পড়ে ২৫টি। চিতড্ডা ইউপিতে ১ হাজার ৫৪৩টির মধ্যে ৮৪টি, ছোট বারেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২ হাজার ৪৫৫টির মধ্যে ৯৭টি, শরাফতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৩৪টির মধ্যে ৬৫টি, শরাফতি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৮৮৭টির মধ্যে ৪৮টি, জোরপুকুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৬৫০টির মধ্যে ৬৮টি, বেওলাইন মহিলা দাখিল মাদরাসায় ১ হাজার ৬৫৩টির মধ্যে ৬১ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। এই ৭টি ভোট কেন্দ্রে ১৬ হাজার ৯২০ জনের মধ্যে শতকরা ২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন। অথচ নির্বাচনী ফলাফলে তা ২৭ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
রাজশাহী-৩ আসনের নির্বাচনে সারাদিন ভোটার শূন্যতায় দুপুর ২টা পর্যন্ত মাত্র ২ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন বলে প্রিজাইডিং অফিসার সূত্রে জানা যায়। তবে ঘোষিত ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, ওই আসনে ভোট পড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। মাত্র ২ ঘণ্টার মধ্যেই বাকি ২৩ শতাংশের বেশি ভোটারের ভোট দেখানো হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের ৬টি জেলার ২১টির মধ্যে যে ১১টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছে তাতে গড় ভোটার উপস্থিতি দেখান হয়েছে শতকরা ৫৩ দশমিক ৩ ভাগ। ভোটের দিন ভোটার শূন্য ভোট কেন্দ্রগুলো সবার চোখে পড়লেও সন্ধ্যার পরেই চালচিত্র বদলে যায় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের কারসাজিতে। প্রায় প্রতিটি কেন্দ্র থেকে বিপুল সংখ্যক ভোট গণনার খবরে বিস্মিত হয়েছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলও। ফলে একদলীয় এ নির্বাচনকে আরো বিতর্কিত করেছে ভোটারবিহীন ভোট কেন্দ্র থেকে বিপুল সংখ্যক ভোট গণনার খবরটি।
বরিশাল-৩ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির টিপু সুলতান ৩৫ হাজার ৩৬০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেখানো হয় জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি গোলাম কিবরিয়া টিপু’কে। টিপু কোন প্রচারণায় না থাকলেও তার পক্ষে ২৩ হাজার ৪০৭ ভোট পড়ে। ঐ নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। পিরোজপুর-৩ আসনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী বর্তমান এমপি আনোয়ার হোসেন ২৫ হাজার ৪০ ভোট পেয়ে হেরে যান স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি ডাঃ রুস্মত আলী ফরাজীর কাছে ফরাজী ২৯ হাজার ৩৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। ঐ আসনে প্রদত্ত ভোট ৩২ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ দুটি নির্বাচনী এলাকা ছাড়া রোববারের ভোটারবিহীন নির্বাচনে বরিশাল বিভাগের অবশিষ্ট ৯টি আসনে প্রদত্ত ভোট দেখান হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। http://comillatimes24.blogspot.com
0 comments:
Post a Comment