
টার্মিনালের সামনে সারিবদ্ধ নৌযান। সেগুলোর ফাঁকে নদীর পানির যতটুকু চোখে পড়ে, তা মিশমিশে কালো। টার্মিনালের পাশজুড়ে আবর্জনার স্তূপ। ঘাটে ভিড়ে থাকা নৌযানগুলো থেকে মাঝেমধ্যেই ফেলা হচ্ছে খাবারের পরিত্যক্ত মোড়ক, ফলের খোসা, বোতলসহ নানা বর্জ্য। ডিঙি নৌকায় পারাপার করা হচ্ছে মানুষ।
সদরঘাটের এই পরিচিত চিত্রের পাশাপাশি এখানকার মানুষ অভ্যস্ত নদীর এই দুর্গন্ধের সঙ্গে। ডিঙি নৌকার মাঝি সোহরাব হোসেন বলছিলেন, ‘গন্ধের দ্যাখছেন কী। ফাল্গুন-চইত মাস আইতে দ্যান, পানি আঠার মতো হইয়া যাইব। তখন আইসেন, খারাইতে পারবেন না।’
বুড়িগঙ্গার দূষণের তথ্য নতুন নয়। তবে সেই দূষণের মাত্রা কতটা বেড়েছে, গতকাল মঙ্গলবার তা পরিমাপ ও পর্যবেক্ষণের কাজে নামে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)। পবার একটি বিশেষজ্ঞ দল বুড়িগঙ্গার সদরঘাট থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশের পানি পরীক্ষা করে। বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবদুস সোবহান। পর্যবেক্ষণে দূষণের মাত্রা শূন্য দশমিক ১২ থেকে শূন্য দশমিক ৪০ পাওয়া গেছে। আর গত বছর এই সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষায় প্রতি লিটার পানিতে দূষণের মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম। বর্তমানে এই দূষণের বিস্তৃতি বাড়ছে।
সদরঘাট থেকে ফতুল্লা
তখন বেলা ১১টা। পবার দলটির সঙ্গে লঞ্চে শুরু হয় যাত্রা। গন্তব্য সদরঘাট থেকে ফতুল্লা। পবার বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে আছে মাল্টিমিটার। নদীর পানি তুলে তৎক্ষণাৎ এই মিটারে পরীক্ষা করা যায়।
শুরুতেই সদরঘাটের পানি। দেখা গেল, সেখানে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) পরিমাণ শূন্য দশমিক ৪০। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর জীবনধারণের জন্য পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম বা এর ওপরে থাকা প্রয়োজন। দলের নেতা আবদুস সোবহান বললেন, ‘এর অর্থ হলো বুড়িগঙ্গায় প্রাণের অস্তিত্ব টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। নদীটি একটি মৃত নদী।’
লঞ্চ এবার ভিড়ে ধোলাইখালের মুখে। এখানে ডিওর পরিমাণ আরও খারাপ, শূন্য দশমিক ৩৮ মিলিগ্রাম।
ধোলাইখাল থেকে মিলব্যারাক, শ্মশানঘাট হয়ে শ্যামপুরের কাছে এসে দূষণের ভিন্ন চেহারা চোখে পড়ল। নদীর বুকে সরাসরি এসে পড়ছে শ্যামপুর শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য মিশ্রিত রঙিন পানি। পাশেই বিআইডব্লিউটিএর ঘাট। এই শিল্পাঞ্চলে আছে ডায়িং (রং), বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের কারখানা। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এভাবে কারখানার পানি সব সময়ই পড়ে। কেউ কিছু বলে না।
পাগলার শোধনাগারের পরিশোধিত পানি পড়ছে নদীতে। সবুজ রঙের সেই পানির ডিও পরীক্ষা করে দেখা হলো, মাত্রা ২ দশমিক ১৬ মিলিগ্রাম। পরিশোধিত হওয়ার পরও পানির এই অবস্থা কেন? জানতে চাইলে পাগলা পয়ঃশোধনাগারের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর বলেন, এখানে পরিশোধন করা হয় সূর্যের আলোর মাধ্যমে। শোধিত পানি নির্দিষ্ট সময়ের আগে নদীতে গিয়ে পড়ার কারণেই হয়তো ডিওর মান ঠিক থাকে না। ক্ষমতার তুলনায় শোধনাগারে বেশি পরিমাণ চাপ থাকায় এটা হতে পারে। তিনি জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে ডিও নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আছে। সেই পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও আছে।
নদীর পানি ভাটির দিকে যত যেতে থাকে, এর মানও ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু পাগলার কাছে পাওয়া গেল উল্টো চিত্র। এখানে নদীর পানির ডিও শূন্য দশমিক ৩৩। তিন কিলোমিটারের পথে কাউকে মাছ ধরতেও দেখা যায়নি।
ফতুল্লা পর্যন্ত গিয়ে লঞ্চ ঘুরে আবার সদরঘাটমুখী হয়। এবার বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ পাড়ের কয়েক জায়গায় থামে লঞ্চ।
পানি পরীক্ষায় দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার ওপারে পানির মান আরও খারাপ। যেমন, পানগাঁওয়ে শূন্য দশমিক ২৩, এর কাছে ইয়ার্ডে ডিওর পরিমাণ শূন্য দশমিক ১২।
বাপার আবদুস সোবহানের বক্তব্য, ওপারের এই চিত্র এটাই প্রমাণ করে যে বুড়িগঙ্গার দূষণ আরও বিস্তৃত হচ্ছে। আগে দক্ষিণ পাড়ের পানির মান আরও ভালো ছিল।
0 comments:
Post a Comment