
‘ভাই রে, কী আর কহবো যি। হামারঘে সামনেই ওই মেয়েটিকে যেভাবে কোপাইলো-তা মুখে বলাই দায়। সে কথা মনে হলেই গা শিহিরা উঠছে। এভাবে মানুষকে কখনো মারে? তারা কি মানুষিই লই।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মোবারকপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নূরজাহান বেগমের ওপর হামলার প্রত্যক্ষদর্শী এক বাসযাত্রী বলেন এ কথা। আওয়ামী লীগকর্মী নূরজাহানের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ভোলাহাটগামী একই বাসের যাত্রী ছিলেন তিনি। গত বুধবার বিকেলে শিবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কের কলাবাড়ী নামক স্থানে নূরজাহানকে বাস থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় দুর্বৃত্তরা।
ওই বর্বর হামলার দৃশ্য দেখার পর থেকে এই যাত্রীর চোখে-মুখে গতকাল বৃহস্পতিবারও আতঙ্ক ছাপ লেগে ছিল। ভয়ে নিজের নামটিও বলতে চাননি তিনি। ওই বাসের আরো কয়েক যাত্রীও জানায়, তাদের সামনেই বাস থেকে টেনে নামিয়ে নূরজাহানকে চায়নিজ কুড়াল ও চাকু দিয়ে কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ কাটে সন্ত্রাসীরা। কয়েকজন যাত্রী তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে গেলেও সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে ধরায় ফিরতে বাধ্য হয়। মোটরসাইকেলে এক ব্যক্তি নূরজাহানের বাসটিকে অনুসরণ করছিল, তা দেখে নূরজাহান আগেই পাশের যাত্রীদের কাছে তাঁর ওপর হামলা হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছিলেন। সহযাত্রীরা এখন সে কথা স্মরণ করে একজন নারীকে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারার মর্মযাতনায়ও ভুগছে। তারা বলেছে, হামলাকারীদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের চিহ্নিত ক্যাডার ছিল। বাসের চালক, সহযোগী চালকসহ ১৮-২০ জনের সামনেই প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে নূরজাহানকে কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ কাটে সন্ত্রাসীরা।
সহযাত্রীটি কালের কণ্ঠকে জানান, বুধবার বিকেল ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বাসটি শিবগঞ্জ হয়ে কানসাট বাজারের গোপালনগর মোড় স্ট্যান্ডে এসে থামে। শিবগঞ্জে বাসটিতে ওঠেন নূরজাহান বেগম। বাসটি গোপালনগর মোড়ে আসার পর মোটরসাইকেলযোগে একজন লোক বাসের পাশে এসে দাঁড়িয়ে তাঁকে ফলো করতে থাকে। বিষয়টি টের পেয়ে নূরজাহান অন্য যাত্রীদের জানিয়ে দেন ওই ব্যক্তির পিছু নেওয়ার কথা। নূরজাহান বাসের পেছনের দিকের একটি সিটে বসেছিলেন। পাশেই বসেছিলেন তাঁর পাশের গ্রামের এক ব্যক্তি। নূরজাহানের কাছ থেকে শুনে মোটরসাইকেলে থাকা ব্যক্তিটিকে একনজর দেখেও নেন তিনি। বাসটি ছাড়লে আর কোনো সমস্যা হবে না বলে নূরজাহানকে অভয় দেন ওই যাত্রী।
বাসটির অন্য এক যাত্রী জানান, বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে বাসটি চলতে শুরু করলে নূরজাহান বেগমের কেন পিছু নিয়েছে ওই ব্যক্তি, তা বর্ণনা করতে থাকেন অন্য যাত্রীদের কাছে। নূরজাহান জানান, তাঁর মোবারকপুর ইউনিয়নের অন্য ইউপি সদস্য বিএনপিকর্মী তসলিম উদ্দিনকে গত ২১ জানুয়ারি পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই গ্রেপ্তারের পেছনে তাঁর হাত ছিল বলে সন্দেহ করে ওই দিনই তসলিমের লোকজন তাঁকে কুপিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে দেবে বলে হুমকি দেয়। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা তৌহিদুর রহমান মিঞা তাঁকে মারার জন্য নেপথ্যে থেকে ইন্ধন দিচ্ছেন। যাত্রীটি জানান, গোপালনগর স্ট্যান্ড থেকে বাসটি ছাড়ার মাত্র তিন-চার মিনিটের মধ্যে কলাবাড়ী বাঁশপট্টি এলাকায় পৌঁছামাত্র একজন যাত্রী সেখানে নেমে যেতে চায়। চালক বাসটি থামানো মাত্র রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা আরো চার-পাঁচজন এসে ওই যাত্রীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে চালককে ধারালো চাকু ধরে বাসটি আর না এগোনোর জন্য বলে। এরপর তারা একযোগে নূরজাহানকে বাসের মধ্য থেকে টেনেহিঁচড়ে নামাতে থাকে। বাসের মধ্যেই তাঁর শরীরে চাকু দিয়ে আঘাত করা হয়। এরপর বাসের নিচে নামিয়ে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে পশুর মতো তাঁর শরীরে একের পর এক আঘাত করা হয়। তাঁর চিৎকারে দু-একজন যাত্রী সাহস করে এগিয়ে গেলেও সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখায়। তারা চলে গেলে যাত্রীরা নূরজাহানকে উদ্ধার করে টেম্পোতে শিবগঞ্জ হাসপাতালে পাঠায়।
গতকাল সকাল ১১টার দিকে নূরজাহানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আশপাশের আরো ছয়-সাতজন নারী ও শিশু বসে আছে। নূরজাহানের বৃদ্ধা মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘হামার বেটিকে বাড়ি থ্যাইকা বাহির হওয়ার সময় মানা করেছুনু যে আজ য্যাস না। তোকে মারার ল্যাইগা ওরা হুমকি দিচ্ছে। বাহির হলে কোপাতে পারে। কিন্তু বেটি হামার কথা না শুনে উপজেলায় কী কাজ আছে কহে চলে যায়। এ্যারপর শুনি বেটিকে চেয়ারম্যানের (বিএনপি নেতা তৌহিদুর রহমান মিঞা) লোকজন কোপাইছে। হামার ধারণায় ঠিক হলো। এই বেটি যদি আর ফিরে না আসে-তাহলে হামরাকে এখন দেখবে কে?’
জানা গেছে, নূরজাহানের পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম নারী। অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে তাঁর ছেলে টমাস, মা মারজিনা বেওয়া, বাকপ্রতিবন্ধী বড় ভাই, তাঁর দুই ছেলেমেয়ে, বোন তাজরেকা বেগম।
নূরজাহানের বোন তাজরেকা বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, নূরজাহান আশপাশের সবার বিপদ-আপদে ছুটে যেতেন। কিন্তু এখন তিনিই বড় বিপদে আক্রান্ত। বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা তাঁকেই এখন বড় বিপদের মধ্যে ফেলে দিল। সেই সঙ্গে সংসারটাকেও ফেলল বিপদে। তিনি যদি আর না ফিরে আসেন, তাহলে তাঁদের সংসারের অন্য ছয় সদস্যকে নিয়ে পথে বসতে হবে।
তাজরেকা বেগম অভিযোগ করেন, ইউপি সদস্য তসলিম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করার পর চেয়ারম্যান তৌহিদের ইন্ধনেই নূরজাহানের ওপর শিবিরের ক্যাডাররা হামলা করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘আমি গত ২৪ ডিসেম্বর থেকে পালিয়ে আছি। কাজেই আমাকে হয়রানিমূলকভাবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত করা হচ্ছে।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের (শিবগঞ্জ) এমপি গোলাম রাব্বানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আক্রান্ত হওয়ার আগে দুপুরের দিকে নূরজাহান আমার কাছে আসেন। তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন। আমি তাঁকে থানায় জিডি করতে বলেছিলাম। শুনেছি থানায়ও গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এর পরেই বাড়ি ফেরার সময় তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা।’
তবে নূরজাহান থানায় যাননি বলে দাবি করেন ওসি এ কে এম মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক কোন্দলের জের ধরেই তাঁর হাত-পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে। তাঁকে আগে থেকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলেও শুনেছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান জড়িত আছেন কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘তিনি তো ঢাকায় পালিয়ে আছেন। এই ঘটনার সঙ্গে কিভাবে জড়িত থাকেন?’ দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত নূরজাহান বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে ওসির সখ্য থাকার কারণে তিনি দুর্বৃত্তদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। নূরজাহানের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের না ধরে তিনি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সাধারণ লোকদের ধরে এনে পাঁচজনকে আটক দেখিয়েছেন বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেছেন।
এদিকে গতকাল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নূরজাহান বেগমের ডান হাত ও ডান পায়ে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, রাতের যেকোনো সময় নূরজাহানকে জাতীয় অর্থোপেডিকস ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু) স্থানান্তর করা হবে। এখন তাঁর অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে গতকাল বিকেলে নূরজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করাতেই আমার ওপর হামলা হয়েছে। যারা গরিবের টাকা মেরে খায়, আমি এর প্রতিবাদ করি। কাবিখার টাকা-পয়সা নিয়ে চেয়ারম্যান তৌহিদুর রহমানের সঙ্গে ঝামেলা ছিল।’
0 comments:
Post a Comment