
শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় নির্ধারিত দিনে ফাঁসি কার্যকর হয়নি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে এর একদিন পর ১২ ডিসেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।ওইদিন সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে বাড়তে থাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিরাপত্তা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে কারাগারে আসেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) মাইন উদ্দিন খন্দকার। এরপর? কীভাবে হয় এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি?
এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে সেই সময়ের কিছু বর্ণনা প্রকাশ করেছে একটি অনলাইন ষংবাদমাধ্যম। আইজি প্রিজনসহ ফাঁসি কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করতে থাকেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। কনডেম সেলে গিয়ে দেখেন ঠিক আছেন কিনা দণ্ডপ্রাপ্ত কাদের মোল্লা। ফাঁসির মঞ্চ, ফাঁসির দড়িও দেখলেন কারা মহাপরিদর্শক।
দেখার কারণ- কোনো চক্র যদি কাউকে প্রলোভন দিয়ে কোথাও ক্যামেরা বা ইলেকট্রিক কোনো যন্ত্র লাগিয়ে রাখে! কারা মহাপরিদর্শক পুরো চিত্র দেখে এসে সময় দিলেন ২২০১ অর্থাৎ রাত ১০টা ১ মিনিট। কাউন্ট ডাউন শুরু…
কারা মহাপরিদর্শককে একজন প্রশ্ন করলেন- স্যার শেষ রাতে করা যায় না? কারা মহাপরিদর্শক বললেন, ওই আইনে (প্রচলিত আইন) রায় কার্যকর হচ্ছে না, এ আইনে (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন) করছি।
এরপর সব আয়োজন সম্পন্ন হলো। ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে আলোকিত করা হলো ফাঁসির মঞ্চ। নিভিয়ে ফেলা হলো দণ্ডপ্রাপ্তকে নিয়ে যাওয়ার পথের আলো।
কারাগারে কয়েদিদের কক্ষগুলোতে ভালো করে তালা দেওয়া হয়েছে কি-না, তাও দেখলেন কারা মহাপরিদর্শক। সমতল থেকে ফাঁসির মঞ্চের উচ্চতা চার ফুট ওপরে। কারা মহাপরিদর্শক, ঢাকা জেলা প্রশাসক, জেল সুপার, সিভিল সার্জনসহ অন্যরা পাশাপাশি বসা। ফাঁসির মঞ্চের প্লাটফর্ম ঘিরে সাতজন করে কারারক্ষী বন্দুক তাক করে আছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়, কারা মহাপরিদর্শক চারজন জল্লাদকে পাঠালেন কাদের মোল্লাকে আনতে। একজন কর্মকর্তাকে পাঠালেন কাদের মোল্লাকে শনাক্ত করার জন্য। শনাক্ত করে কনডেম সেল থেকে বের করে জম টুপি পরানো হলো। পিছনে লাগানো হলো হ্যান্ডকাপ।
ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মঞ্চের দিকে আসতে চান নি কাদের মোল্লা। চারজন জল্লাদ জোর করে তাকে নিয়ে আসলেন ফাঁসির মঞ্চের কাছে।উঠতে চাচ্ছিলেন না, প্রায় জোর করেই মঞ্চের প্লাটফর্মে উঠানো হলো। পা ছড়িয়ে রাখেন তিনি। কিন্তু পা ছড়িয়ে রাখলে লিভার কাজ করে কম- কারা কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন তিনি… তাই পা দুটো একসঙ্গে বেঁধে ফেলা হলো। গলার দড়ি পরানোর কাজও চলছিল।
‘জেলার সাহেব আছেন’, আছি (ফরমান আলী, জেল সুপার)। ‘আমার কয়েকটা কথা আছে…’ কাউন্ট ডাউনের কাছাকাছি ঘড়ির কাঁটা। জেল সুপার বললেন, কথা আছে ঠিক আছে, আগে পা একখানে করেন। ২২০১ ঘণ্টা। আর এক মুহূর্ত দেরি নেই…।
কারা কর্তৃপক্ষ আগে থেকে ভেবেছিলেন তিনি (কাদের মোল্লা) হয়তো চিৎকার করতে পারেন। তার চিৎকারের প্রতিধ্বনিও আসার শঙ্কা ছিল, সেজন্য কৌশলী ছিলেন তারা। কারাগারে উৎকর্ণ ছিল ৫ হাজার কয়েদি, আজ কিছু একটা হতে যাচ্ছে…।
দড়ির মাথায় লাগানো একটা লিভার আছে। লিভার টান দিলে প্লাটফর্ম ফাঁক হয়ে নিচের দিকে নামবে যার দণ্ড কার্যকর হবে। জল্লাদ লিভার টান দেওয়ার পর শুধু দৃশ্যমান দড়িটি একটু নড়ে উঠলো। এরপর স্থির…।
১৫ মিনিট পর প্লাটফর্মের তালা খুলে লাশ বের করা হলো। দড়ি, হ্যান্ডকাপ ও পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো। এরপর সিভিল সার্জন অপারেশন টেবিলে তাদের কাজ করলেন। ১০টা ২০ মিনিটের দিকে দুটো অ্যাম্বুলেন্স ভিতরে ঢুকানো হলো।
কৌশলে দু’দিকের ফটক খোলা রাখা হলো, যাতে বোঝা না যায় কোন দিকে লাশ যাবে।রাতেই গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুরে লাশ নেওয়া হলো। তার ভাই মনি মোল্লা পরদিন বাদ জুমা কবর দিতে চাইলেও ফাঁসির আসামি হিসেবে ভোরের আগেই কবর দেওয়া হলো কাদের মোল্লাকে।
কাদের মোল্লার লাশ পাঠিয়ে কারাগারের বাইরে সাংবাদিকরা কর্তৃপক্ষের বিবৃতির জন্য ছিলেন অপেক্ষমাণ। কারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এক কারারক্ষী পড়ে শোনালেন- ফাঁসির কার্যক্রম চলে জেল কোডে, বিবৃতি দেওয়া জেল কোডের বিধান নেই, বিবৃতি দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই…।
0 comments:
Post a Comment