Sporty Magazine official website |

দেয়াল যখন কথা বলে

Wednesday, January 22, 2014

Share this history on :
ভীতি আর ত্রাসে কখনো কখনো অনেকেই গলার স্বর নামিয়ে আনেন, আর সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘চুপ! চুপ! দেয়ালেরও কান আছে।’ কিন্তু তারুণ্য আর শিল্পীর স্পর্ধা এসবের থোড়াই পরোয়া করে। সুন্দরের স্বপ্ন আর অন্যায়ের প্রতিবাদে শিল্পীর রং-তুলি ‘কান পাতা’ দেয়ালের মুখেও কথা ফুটিয়ে তুলতে পারে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে হালের ‘গ্রাফিতি’ বা দেয়ালচিত্রগুলোও যেন তেমনি কথা বলে উঠছে!
অবশ্য গ্রাফিতি নয়াদিল্লিতে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক এ নগরে সাম্প্রতিক দেয়ালচিত্রগুলোতে যেন এ শিল্পের একটা শক্তিশালী নব-তরঙ্গ দেখা যাচ্ছে। সাধারণত জনপ্রিয় ধারার বিমূর্ত-অর্ধবিমূর্ত শিল্পরীতি, সাই-ফাই অ্যানিমেশন রীতি এবং নৈরাজ্য-সঞ্চারী ক্ষোভ-দ্রোহ আর নানা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেই ভরা থাকে এসব গ্রাফিতি। তবে এবার নগরের রাজপথগুলোতে মিছিলের পর মিছিলের মতোই দেয়ালগুলোও ছবি আর লেখায় কথা বলে উঠছে একের পর এক ধর্ষণ আর যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে। এসব দেয়ালচিত্র এ প্রতিবাদে এতটাই উচ্চকিত যে তা স্থানীয় বাসিন্দাদের মতোই নয়াদিল্লিতে ভ্রমণকারীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
অসংকোচ প্রকাশ
নয়াদিল্লির আলো ঝলমলে রাজপথ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, উদ্যান কিংবা আবছায়া আন্ডারপাস—সবখানেই চোখে পড়ছে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। অসংকোচ প্রকাশের স্পর্ধায় এসব দেয়ালচিত্র আর লেখাজোখা সরাসরি আছড়ে পড়বে আপনার চোখে-মুখে। আঘাত করবে, বিব্রত করবে, প্রশ্ন করবে আইন-কানুন, সরকার-দেশ-জাতি-রাষ্ট্র-ধর্ম সবাইকেই। তবে কেবল ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধেই নয়, লৈঙ্গিক বৈষম্যসহ প্রাসঙ্গিক ও সমকালীন নানা সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধেও কথা বলছে এই দেয়ালচিত্র।
ছাত্র-তরুণ-শিল্পী
নয়াদিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহর-বন্দরে সম্প্রতি একের পর এক ধর্ষণ-যৌন নিপীড়ন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়নের পর হত্যা ও মৃত্যুর ঘটনায় প্রবলভাবে আন্দোলিত হয়েছে দেশটির ছাত্র-তরুণ ও শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা। ধর্ষণ-গণধর্ষণের নানা ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভের যে ঢেউ উঠেছিল সেখানে তরুণদের বিপুল অংশগ্রহণেই তা স্পষ্ট ছিল। আর দেয়ালে দেয়ালে এই শিল্পিত প্রতিবাদেরও নেপথ্য সৈনিক তাঁরাই।
‘এটা প্রতিবাদের একটি ধরন এবং আমরা একটা মাধ্যম মাত্র। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরের ধর্ষণের ঘটনার পর নিপীড়নের বিরুদ্ধে শিল্পের এই লড়াইয়ে আমি ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়ি। সমাজে যেকোনো ধরনের অবিচারই আমাকে পীড়া দেয় এবং আমার কাজে তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি।’ ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ বা সর্বভারতীয় ছাত্র সংঘের সঙ্গে ক্রিয়াশীল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ শিল্পী ‘হিন্দুস্থান টাইমস’-এর কাছে এভাবেই দেয়ালচিত্র প্রতিবাদে নিজের সম্পৃক্ততার কথা জানান। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় বহু গ্রাফিতিই এই শিল্পীর আঁকা। গত ছয় বছর ধরে সর্বভারতীয় ছাত্র সংঘের সঙ্গে যুক্ত এই শিল্পী আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় অনেক বই এবং জার্নালের চেয়েও এই দেয়ালগুলো অনেক বেশি কিছু বলে। এরা স্পষ্ট একটা অবস্থান নেয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক তরুণ শিল্পী বলেন, ‘“নারীদের সম্মান করা উচিত” শুধু এই বার্তা প্রচারেই অনেকগুলো গ্রাফিতি করেছি আমরা। রাজপথে যেমন মিছিল হয়, মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয় ঠিক তেমনি এটাও প্রতিবাদের একটা ধরন। কিন্তু এটা খুবই দুঃখজনক যে মাঝেমধ্যেই একটা গ্রাফিতি করার পরপরই ওই রঙের প্রলেপ দিয়ে তা ঢেকে দেয় কর্তৃপক্ষ।’
নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা নয়!
প্রচলিত ধারণায় গ্রাফিতি শিল্পীদের কর্মকাণ্ডকে খুবই খামখেয়ালিপূর্ণ; আর যখন যা ইচ্ছা মনে করা হলেও বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। রীতিনীতি আর আইন-কানুনের ধার ধারেন না বলে এই শিল্পীদের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য সৃষ্টি আর তা প্রচারের অভিযোগ তোলা গেলেও তাঁদেরকে বিশৃঙ্খল ভাবা ঠিক হবে না। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন নগরের গ্রাফিতি শিল্পীদের মতোই নয়াদিল্লির এই ঘরানার শিল্পীরাও ভালোই সংঘবদ্ধ।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংঘের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আন্দোলনকর্মী সুচেতা দে জানিয়েছেন, কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সংগঠিত প্রচারে নামার আগে এ নিয়ে প্রস্তুতি নেন তাঁরা। অনেক সময় এক দুই মাস আগেই এ নিয়ে কাজ শুরু করেন শিল্পী ও ছাত্র কর্মীরা। সুচেতা বলেন, ‘সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে প্রতিবছর একটা বিশেষ পোস্টার প্রচার করি আমরা। সমাজে এসবের প্রভাব আছে বলেই দেখেছি আমরা।’
বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র সংঘের সভাপতি আকবর বলেন, ‘আমাদের শিল্পচর্চার একটি লক্ষ্য আছে। আমরা একটা ইস্যু বেছে নিই এবং তা নিয়ে পোস্টার করি, গ্রাফিতি করি, কবিতা লিখি। গত বছরজুড়ে আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলেছি এবং সমাজে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে দেখেছি।’
সুন্দর না কুৎসিত?
গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্রের উদ্দেশ্য যত মহৎ হোক, এ নিয়ে সমাজের মতোই মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিশেষজ্ঞদের। চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী অঞ্জলি থমাস বলেন, ‘এর দুটি প্রতিক্রিয়া হয়। একটা হলো—এতে করে মানুষের মধ্যে এটা সচেতনতা বাড়াবে এবং সবাই বুঝবে যে এই ইস্যুতে একটা শক্তিশালী আন্দোলন হচ্ছে। আরেকটি হলো—যখন সামাজিক বাস্তবতা খুব একটা পালটাচ্ছে না কিন্তু বারবার ঘুরেফিরে এই বার্তা আপনার চোখে পড়ছে তখন এটা মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা বাড়াবে।’
তবে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শারিকা শর্মা মনে করেন, এই যে রাস্তার দেয়ালগুলোও কথা বলে উঠছে এটা খুবই ভালো। শারিকা বলেন, ‘এসব দেখে আমার মনে হয় যে সমাজ ওই ঘটনাগুলো ভুলে যাচ্ছে না এবং তারুণ্যের মধ্যে এখনো আগুন আছে, যা হয়তো একদিন ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তাই ভবিষ্যতের আশা আছে।’
আইনে যা আছে
ভারতীয় আইন অনুসারে জনগণের সম্পত্তি দৃশ্যপট পাল্টে দেওয়া (ছবি আঁকা, রং পাল্টে দেওয়া), ক্ষতিসাধন করা এবং কোনো শ্রেণী-ধর্ম-বর্ণের সংবেদনশীলতায় আঘাত হানার কারণে যেকোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জেল-জরিমানা হতে পারে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এ বিষয়ে এমন আইন থাকলেও দুনিয়াজুড়েই বাজারি শিল্পকলার বাইরের এই গ্রাফিতি বা দেয়ালচিত্র এবং নানান ধরনের ‘স্ট্রিট আর্ট’ বা পথ-শিল্প খুবই জনপ্রিয়। আর এর ইতিহাস এতই পুরোনো যে প্রাচীন মিসর, গ্রিস এবং রোমান সাম্রাজ্যেও এর নিদর্শন আছে।
Thank you for visited me, Have a question ? Contact on : youremail@gmail.com.
Please leave your comment below. Thank you and hope you enjoyed...

0 comments:

Post a Comment