Sporty Magazine official website |

মাদকে আসক্ত হচ্ছে শিশুরা

Wednesday, February 26, 2014

Share this history on :
পরথমে বন্ধুদের কাছ থেইকা লইয়া সিগারেট খাইছি। হের বাদে গাঁজা আর মদ খাওয়া ধরছি। খুব মজা লাগে খাইতে।’ কথাগুলো বলছিল নয়ন নামে ১৩ বছরের এক শিশু। নয়নের বাড়ি ফরিদপুরে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সে দুই বছর আগে ঢাকা চলে আসে। থাকে কারওয়ান বাজার বস্তিতে। এক ট্রাকচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন ২০০ টাকা পায়। প্রায় সব টাকাই গাঁজা ও মদের পেছনে চলে যায়। নয়ন বলে, পড়ালেখা আর ভালা লাগেনা। গাঁজ আর মদই ভালা।’
নয়নের মতো কবীরও মাদকে আসক্ত। কবীর (১৫) থাকে মা-বাবার সঙ্গে কারওয়ান বাজার বস্তিতে। একসময় গাঁজা বহনের কাজ করত। অন্যদের দেখাদেখি সে প্রায় ছয় বছর আগে গাঁজা খাওয়া শুরু করে। এখন মাঝেমধ্যে মদ ও ইয়াবাও খায়।
নয়ন ও কবীরের দেখা পাই ৫ ফেব্রুয়ারি কারওয়ান বাজার রেলগেটের পাশে বালুর মাঠে লেকের পাশে। সেখানে এই দুই শিশুসহ বেশ কয়েকটি শিশু গোল হয়ে বসে গাঁজা সেবন করছিল। এদের মতো দেশে বহু শিশু মাদকে আসক্ত। তবে সঠিক সংখ্যা অজানা। এসব শিশু গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, সিসা, ড্যান্ডি, ইয়াবা, পেথিড্রিন ইত্যাদি মাদকে আসক্ত। এসব মাদকদ্রব্য গ্রহণের কারণে তারা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। ঝরে পড়ছে বিদ্যালয় থেকে।
কারওয়ান বাজার ছাড়াও কমলাপুর রেলস্টেশন, দোয়েল চত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম চত্বর, চানখারপুল, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল, ঢাকা মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, শিশুরা বিভিন্ন ধরনের মাদক খাচ্ছে বা নিচ্ছে। এদের বেশির ভাগই পথশিশু। এসব এলাকায় সক্রিয় মাদক বিক্রেতারা।
আর্ন্তজাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মোস্ট অ্যাট রিস্ক অ্যাডোলসেন্ট (এমএআরএ) নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০১২ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চার লাখ ৪৫ হাজার পথশিশু আছে। এদের মধ্যে রাজধানীতে থাকে তিন লাখেরও বেশি পথশিশু। এদের বেশিরভাগই মাদকে আসক্ত
সরেজমিনে দেখা গেছে, ড্যান্ডি নামে নতুন ও সহজলভ্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে পথশিশুরা। ড্যান্ডি একধরনের আঠা, যা মূলত সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে একটি উপাদান আছে। টলুইন মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার টিউব লাগানোর কাছে ব্যবহার করা হয়। এটি খেলে ক্ষুধা ও ব্যথা লাগে না। দীর্ঘমেয়াদে খেলে মস্তিষ্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শুধু বস্তি বা পথশিশুই নয়, মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুরাও। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর বনানী, গুলশান, ধানমন্ডির বেশ কয়েকটি খাবারের দোকানের আড়ালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সিসা গ্রহণ করে। গত বছরের ৩০ আগস্ট ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে অবস্থিত এইএইচএফ ফুড অ্যান্ড লাউঞ্জ নামের একটি সিসা বারে অভিযান চালানো হয়। পরে ওই বার বন্ধ করে দেওয়া হয় । ছেলেশিশুদের পাশাপাশি বহু মেয়েশিশুও মাদকে আসক্ত। তবে সঠিক সংখ্যা অজানা।
মাদক শিশুদের জন্য কেমন ক্ষতিকর, জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় মাদকাশক্তি নিরাময়কেন্দ্রের আবাসিক মনোরোগ চিকিৎসক আখতারুজ্জামান সেলিম বলেন, মাদক গ্রহণকারীর বয়স যত কম হবে, তার ক্ষতির পরিমাণ বেশি হবে। সে ক্ষেত্রে শিশুদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়। মাদক গ্রহণের কারণে তাদের সুষ্ঠু বিকাশ বিঘ্নিত হয়। পরিকল্পনা গ্রহণে সমস্যা হয়। লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। সামাজিকীকরণে সমস্যা হয়।
এটি নিরাময়যোগ্য কি না, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য, তবে সেটি সময়সাপেক্ষ। শিশুদের আলাদা স্থানে আলাদাভাবে নিরাময় করতে হবে। বড়দের সঙ্গে রাখলে উল্টো ফল হতে পারে।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একবার সিসা গ্রহণে যে পরিমাণ নিকোটিন শরীরে যায়, তা ১০০টি সিগারেটের সমপরিমাণ। সিসা সিগারেটের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর।
বহু শিশু মাদকে আসক্ত হলেও সরকারি পর্যায়ে শিশুদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সরকারি নিরাময়কেন্দ্র আছে মাত্র চারটি। এগুলোতে শয্যাসংখ্যা ৫৫টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে মাদকাসক্ত শিশুদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রোটেকশন অব বাংলাদেশ(সিএসপিবি) নামে একটি প্রকল্প রয়েছে সরকারের। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের কিছু স্থানে ড্রপ ইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে মাদকাসক্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হয়। আপনগাঁও, আহ্ছানিয়া মিশনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা মাদকাসক্ত শিশুদের নিরাময় ও পুনর্বাসনে কাজ করছে।
রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো অনেক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এগুলোর বেশির ভাগেরই নিবন্ধন নেই। এসব কেন্দ্রে মাদকাসক্তদের সুস্থ করার নামে চলে নানা অপচিকিৎসা। এসবে কেন্দ্রে চিকিৎসক নেই, নেই চিকিৎসা সরঞ্জাম। অনেক কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদকদ্রব্য কেনাবেচার অভিযোগ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের সূত্রমতে , ২০০৫ সালে প্রণীত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা বিধিমালা অনুসারে কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীতে গড়ে ওঠা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে মধ্য বাড্ডার সেতু মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র, এলিফ্যান্ট রোডের সেবা মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ চিকিৎসা কেন্দ্র, উত্তর গোড়ানের প্রশান্তি মাদকাসক্তি ও পুনর্বাসন সহায়তা কেন্দ্র, মিরপুরের ফেরা মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র, মোহাম্মদপুরের ক্রিয়া মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র, নিকুঞ্জ-২-এ দিশা মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র, গুলশান-২-এ মুক্তি মানসিক ও মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র লিমিটেড, উত্তরার লাইট হাউস ক্লিনিক, বারিধারার প্রত্যয় মেডিকেল ক্লিনিক লিমিটেড ও ফার্মগেটের হাইটেক মডার্ন সাইক্রিয়াটিক হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড।
সেতু মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুক্তি দাশ বলেন, মাদকাসক্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১২ সালে তাঁর কেন্দ্রে ১০ জন শিশুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ২০১৩ সালে ১৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে। আর ২০১৪ সালের প্রথম দেড় মাসেই ৪ টি শিশুর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আতোয়ার রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে কত শিশু মাদকাসক্ত, এর পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। তবে পথশিশুদের মাদকাসক্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে অধিদপ্তরে শিশুদের আলাদা একটি ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সেখানে তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার কাজ চলছে। তিনি বলেন, মাদক দূর করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আমরা সে কাজ করে যাচ্ছি। মাদক থেকে শিশু ও যুবসমাজকে দূরে রাখতে ও সচেতনতা বাড়াতে জেলায় জেলায় চলচ্চিত্র দেখানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’
আতোয়ার রহমান আরও জানান, শিশুরা যাতে ড্যান্ডি ব্যবহার না করে সেজন্য একটি আইন করার প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আইন করার পর যারা এগুলো মাদক হিসেবে ব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সিসাকে মাদকদ্রব্য হিসেবে গণ্য করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
Thank you for visited me, Have a question ? Contact on : youremail@gmail.com.
Please leave your comment below. Thank you and hope you enjoyed...

0 comments:

Post a Comment