
বদলে যাওয়া ক্যাম্পাস: কলেজের মূল ফটক দিয়ে ঢুকলে আগে চোখে পড়ত শ্রীহীন কালো রঙের একটি শহীদ মিনার। এখন সেটি নেই। ফটকের বাঁ পাশের দেয়াল ঘেঁষে তৈরি হয়েছে সাদা পাথরের নতুন শহীদ মিনার। ’৫২ থেকে ’৭১ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে করা ম্যুরাল শোভা পাচ্ছে স্মৃতিসৌধের পাশের দেয়ালটিতে। ৪০ ফুট দীর্ঘ ও চার ফুট চওড়া ম্যুরালে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও একাত্তরের মুক্তিসংগ্রাম চিত্রিত হয়েছে।
নতুন অবকাঠামো: গত এক বছরে অনেকটাই খোলনলচে পাল্টে ফেলেছে কলেজটি। শহীদ মিনার, বাগান ও রাস্তার পাশাপাশি সংস্কার করা হয়েছে কলেজের সীমানাপ্রাচীরের। এ ছাড়া চারতলাবিশিষ্ট নতুন প্রশাসনিক ভবন ও কর্মচারীদের ডরমিটরি নির্মাণ, মিলনায়তন সংস্কার, প্যারেড ময়দানের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও আধুনিকায়ন, ছাত্রাবাস নির্মাণ, শিক্ষক ডরমিটরির সংস্কার, পানীয় জল সরবরাহের ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
পরিবর্তন ভেতরে-বাইরে: কেবল বাইরে নয়, পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে এই কলেজের ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর মেধা ও মননে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই কলেজে অন্য কোনো সংগঠনের রাজনীতি করার সুযোগ নেই দীর্ঘকাল ধরেই। মত প্রকাশের স্বাধীনতাও সীমিত। তবে এ পরিস্থিতি বদলাতে উদ্যোগ নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতার ম্যুরাল ও শহীদ মিনার তৈরি করা হয়েছে সে বিষয়টি মাথায় রেখে। এর পাশাপাশি স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে বড় পরিসরে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মুক্তিযুদ্ধের গান ও আবৃত্তির আসরেরও আয়োজন করা হচ্ছে।
কীভাবে এ পরিবর্তন: সড়ক সম্প্রসারণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) চট্টগ্রাম কলেজের কিছু ভূমি অধিগ্রহণ করেছিল, যার ক্ষতিপূরণ হিসেবে কলেজটি পেয়েছে ১২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ এ টাকা না নিয়ে বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুরোধ জানায় চউক কর্তৃপক্ষকে। ২০১২ সালের ৫ জুন এ নিয়ে চউকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তিও হয় কলেজ কর্তৃপক্ষের।
পরিবর্তনের নায়কেরা: গত সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম কলেজে গেলে কথা হয় অধ্যক্ষ শেখর দস্তিদারের সঙ্গে। কেন এই পরিবর্তন? অধ্যক্ষ বললেন, ‘সরকারি কলেজের ভৌত অবকাঠামো সংস্কারের জন্য তেমন বরাদ্দ পাওয়া যায় না। সিডিএর কাছ থেকে পাওয়া এই টাকা দিয়ে আমরা কলেজেটাকে নান্দনিক রূপ দিতে চেষ্টা করেছি। জনমনে এই কলেজ নিয়ে বিরূপ ধারণা আছে। অথচ ’৭১ সালের ২৩ মার্চ এই কলেজে মমতাজ উদ্দীন আহমদের নাটক স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা এই কলেজে প্রথম মঞ্চায়িত হয়েছিল। আমরা সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে চাই।’
কথা হয় কলেজে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরালের নির্মাতা শিল্পী দীপক দত্তের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেড় শ বছরের পুরোনো ক্যাম্পাসে এমন একটি ম্যুরাল করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। টানা তিন মাস কাজ করে ম্যুরালটি তৈরি করেছি। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়, কেবল প্রাণের তাগিদেই এমন একটা কাজে জড়িত হওয়া।’
শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া: কলেজের ইতিহাস বিভাগের সেমিনারকক্ষে আড্ডা দিচ্ছিলেন শিক্ষার্থীরা। কথা হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন বলেন, ‘ক্যাম্পাসটা এখন ভীষণ সুন্দর লাগে। বিশেষ করে প্যারেড ময়দান, কলেজের ফটক, ফুলের বাগান। সব মিলিয়ে আগের চেয়ে অনেক খোলামেলা মনে হয়।’ তাঁর সঙ্গে গলা মেলালেন সহপাঠীরাও। কয়েকজন সমস্বরে বললেন, হ্যাঁ, কলেজটা সত্যিই বদলে গেছে।
0 comments:
Post a Comment