
১৭ ফেব্রুয়ারি রোজ সোমবার ঢাকার আকাশে যেমন নানা রঙের মেঘের খেলা, ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটাও তো কম রং বদলাল না। শেষ পর্যন্ত রাত নয়টা ২২ মিনিট নাগাদ সেটি হয়ে গেল ‘নীল’। তা আর বদলানোর নয়। সেটি নীল-ই হয়ে থাকল।
‘নীল’-এর অর্থ এখানে একাধিক। শ্রীলঙ্কার জার্সির রং নীল। বেদনার রংও কি তাই নয়? জয়ের মুখ থেকে কেড়ে আনা এমন পরাজয় আবারও নীল বেদনায় ছেয়ে ফেলল লাল-সবুজের ড্রেসিংরুম। ড্রেসিংরুম ছাপিয়ে আসলে পুরো বাংলাদেশকেই। পরপর দুটি টি-টোয়েন্টিতে স্বপ্নভঙ্গের পর ওয়ানডে সিরিজের শুরুটাও সেই ‘এত কাছে তবু এত দূর’ আক্ষেপের গল্প।
ফাগুনে হঠাৎ সন্ত্রাস হয়ে দেখা দেওয়া বৃষ্টি ম্যাচটির পাশেই এঁকে দিয়েছিল প্রশ্নচিহ্ন। আগের বিকেল থেকে প্রায় বিরতিহীন ঝরে যাওয়া সেই ইলশে গুঁড়িতেই ঘুম ভেঙেছে দিনের। শীতের বিদায়ী বার্তাবাহী সেই বৃষ্টি থামতে না-থামতেই ঝকঝকে রোদ। তখন প্রায় দুপুর।
ম্যাচের সঙ্গে মিল আছে। আবার নেই-ও। বৃষ্টির পর রোদ হেসেছে। এরপর হেসেই গেছে। বৃষ্টিস্নাত আকাশে সোনারোদের আলোয় আর ছায়া পড়েনি। রাতের প্রথম প্রহরে বৃষ্টি আবার দেখা দেওয়ার আশঙ্কা জাগিয়েও মিলিয়ে গেছে। কিন্তু ম্যাচটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা রঙের খেলা দেখিয়েই গেল।
২২তম ওভারে শ্রীলঙ্কা ৮ উইকেটে ৬৭। পৌনে দুই ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়া সংক্ষিপ্ত ম্যাচ তা হলে সংক্ষিপ্ততর হয়ে যাচ্ছে! থিসারা পেরেরা ব্যাট করতে জানেন। কিন্তু কতই আর করতে পারবেন? করলেন অপরাজিত ৮০। নবম উইকেটে সেনানায়েকের সঙ্গে ৮২ রানের জুটিতে শ্রীলঙ্কা ১৮০।
বাংলাদেশের ফিল্ডাররা ক্যাচের পর ক্যাচ না ফেললে তা হয় না। এক পেরেরারই ক্যাচ পড়েছে তিন-তিনটি। এর মধ্যে লং অনে সোহাগ গাজী প্রথমটি নিতে পারলে শ্রীলঙ্কা ৯ উইকেটে ৭৪ হয়ে যায়। উল্টো সেটি ছক্কা। ছক্কা পরের দুই বলেও।
সেনানায়েকে ৩০ রান করে গেলেন। ম্যাচ শেষে যেটির মূল্য বেড়ে গেল এর চেয়ে বহু গুণ। অথচ ৫ রানেই তাঁর ফিরে যাওয়ার কথা। গেলেন না, কারণ স্লিপে তাঁর ক্যাচ ফেলেই মাহমুদউল্লাহ ম্যাচজুড়ে ব্যর্থতার প্রদর্শনী শুরু করলেন।
ওয়ানডেতে থিসারা পেরেরার আগের সর্বোচ্চ অপরাজিত ৬৯ শ্রীলঙ্কাকে উপহার দিয়েছিল অবিশ্বাস্য এক জয়। বছর দুয়েক আগে কিম্বার্লিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ২৯৯ তাড়া করার মূলে ছিল ৪৪ বলের ওই ঝোড়ো ইনিংস।
পরিস্থিতি বিবেচনায় কালকের ৮০-এর পাশে ওই ‘ঝোড়ো’ শব্দটা আরও বড় অক্ষরে লেখা উচিত। তবে ৫৭ বলে ৬টি ছয় ও ৪টি চারে সাজানো এই ইনিংসেরও কি সাধ্য আছে নাকি এই ম্যাচ জেতানোর, যেখানে বাংলাদেশের ইনিংস ১৭তম ওভারেই ছুঁয়ে ফেলেছে তিন অঙ্ক! পেরেরারই তিন বলে দুই ছক্কা মেরে শামসুর নিজের ৫০ আর দলের ১০০ আনলেন একই সঙ্গে। দ্বিতীয় বলেই এনামুলকে হারিয়ে ফেলাটা কোনো ব্যাপারই মনে হচ্ছে না তখন। ১৫৭ বলে প্রয়োজন ৮২ রান, হাতে ৮ উইকেট—এটা কোনো ব্যাপার নাকি!
তখন কে জানত, ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো এই ম্যাচে সেটিই যে এমন গুরুতর ব্যাপার হয়ে উঠবে! হাত থেকে ব্যাট ফেলে অদ্ভুতুড়ে এক রানআউট হলেন শামসুর। তা না হয় হলেনই। ৭ উইকেটের নির্ভরতা থাকলে ১৪০ বলে ৬৭ রান তো হেসেখেলে হয়ে যাওয়া উচিত। আর ৫ রান যোগ হতেই সাকিবও রানআউট। তখনো পরপর দুটি টি-টোয়েন্টিতে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা যে আরও গাঢ় হয়ে হতে যাচ্ছে, সেটির কোনো আভাস নেই।
সেই আভাস প্রথম পাওয়া গেল একই স্কোরে নাসির ও মাহমুদউল্লাহর বিদায়ে। এক প্রান্তে মুশফিকুর রহিম অসহায় চোখে অন্য প্রান্তে আসা-যাওয়ার মিছিল দেখে গেলেন। ৮ উইকেটে ১৬১ হয়ে যাওয়ার পরও আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলছিলেন মুশফিকই। সেটি নিভে গেল ম্যাথুসকে স্কুপ মারতে গিয়ে। পুরস্কার বিতরণীটা আসলে তখনই সেরে ফেলা যেত!
হ্যাঁ, একটা উইকেট তখনো ছিল। ১৯ রান এমন অসম্ভব কিছু নয়ও। কিন্তু রুবেল আর আল আমিনের শেষ জুটির জন্য আসলে অসম্ভবই। ইয়র্কার আর বাউন্সারের মিশেলে বিশ্বের বড় বড় ব্যাটসম্যানেরই নাভিশ্বাস তুলে ফেলা লাসিথ মালিঙ্গার বোলিংয়ে রান করবেন কি, টিকে থাকাই তো ডিঙি নৌকায় সাগর পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসের সমতুল্য।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা অবশ্য মালিঙ্গার হাতে শেষ হয়নি। শেষ হয়েছে রানআউটে। পাঁচ রানআউটের ম্যাচে ব্যাপারটা প্রতীকীও বটে। রুবেলকে রানআউট করে স্টাম্প তুলে নিয়ে ম্যাথুস যে দৌড়টা দিলেন, প্রতীকী সেটিও। সঙ্গে চিৎকার-টিৎকারও থাকল। আর শ্রীলঙ্কার তুমুল উদ্যাপন। বাঘের থাবায় ক্ষতবিক্ষত সিংহ উল্টো মরণকামড় দিয়ে দেওয়ার পর এমন গর্জনই দেওয়ার কথা।
মেঘ রং বদলায়। রং বদলায় ক্রিকেট ম্যাচও। সমস্যা একটাই। সিরিজে ওভার নির্দিষ্ট ম্যাচ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের ভাগ্যের রং আর বদলাচ্ছে না। সেটি হয়ে থাকছে বেদনার নীলই!
শ্রীলঙ্কা: ৪০ ওভারে ১৮০
বাংলাদেশ: ৩৯.২ ওভারে ১৬৭
ফল: শ্রীলঙ্কা ১৩ রানে জয়ী
0 comments:
Post a Comment