
তবে গ্রেপ্তার হওয়া ‘পাচারকারী’ সামছুল হকের দাবি, র্যাব তাঁর কাছ থেকে ১৪ হাজার ৬৫০ ডলার নিয়ে গেছে। র্যাবের দাবি, অভিযানের সময় খোকন নামের এক ব্যক্তি ডলার নিয়ে সটকে পড়েন।
অসংগতি আছে র্যাবের ক্যাপ্টেন নাহিদ আল-আমিন আহত হওয়ার তথ্য নিয়েও। র্যাবের করা মামলায় বলা হয়েছে, পাচারকারীদের একজন তাঁকে রড দিয়ে পিটিয়েছেন। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে আছে, তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত (আরটিএ) হন। মামলায় ঘটনার সময় বলা হয়েছে রাত তিনটা। কিন্তু আহত হয়ে ক্যাপ্টেন নাহিদ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন রাত ১১টা ১০ মিনিটে।
মামলায় বলা হয়েছে, অভিযানের সময় (শুক্রবার রাতে) ক্যাপ্টেন নাহিদকে পিটিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সবুর (৬৭)। র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শনিবার দুপুর একটা ৩০ মিনিটে আশুলিয়ার দোসাইদ বাজার থেকে স্বর্ণ ও ডলার চোরাচালান চক্রের মূল হোতা সবুর চেয়ারম্যানকে আটক করা হয়।
র্যাবের হাতে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সাভার মডেল থানার এএসআই ফজিকুল ইসলাম (৩৫), অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক রেজাউল হক (৪০), মো. সুজন শেখ (২৫), মিরান খান (৩৫), সামছুল হক (৫৮), সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সবুর (৬৭)। এঁদের বিরুদ্ধে গত রোববার দুটি মামলা করেছে র্যাব। একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভুয়া পরিচয়ে র্যাবের ওপর হামলা। অন্যটি অস্ত্র আইনে।
র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সামছুল হকের দেওয়া তথ্যমতে সবুর চেয়ারম্যানকে আটক করা হয়। সাভার মডেল থানায় আনা হলে আবদুস সবুর বলেন, ‘আমি দুপুরে বাজারে বসে চা খাচ্ছিলাম। র্যাব আমাকে নিয়ে এসেছে। কেন এনেছে বুঝতে পারছি না।’
র্যাব-৪-এর অধিনায়ক মেজর মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, অভিযানের সময় খোকন নামের এক ব্যক্তি ডলার নিয়ে সটকে পড়েন। তবে র্যাবের মামলায় খোকন ওরফে সাজ্জাদ নামটি উল্লেখ থাকলেও পিতার নাম ও ঠিকানা দেওয়া নেই। ডলারের প্রসঙ্গ নেই।
মডেল থানা সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে এএসআই ফজিকুল জানিয়েছেন, খোকনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি অভিযানে গেছেন। খোকনের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর। তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করেন।
প্রথম খুদে বার্তা: গত শনিবার সকাল পৌনে নয়টায় র্যাব থেকে গণমাধ্যমকর্মীদের মুঠোফোনে পাঠানো খুদে বার্তায় (এসএমএস) বলা হয়, সাভারে সন্ত্রাসীদের আক্রমণে একজন র্যাব সদস্য গুরুতর আহত। তিনি বর্তমানে ঢাকা সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন। অস্ত্রসহ পাঁচ সন্ত্রাসী আটক।
দ্বিতীয় খুদে বার্তা: বেলা পৌনে দুইটার দিকে পাঠানো আরেকটি এসএমএসে বলা হয়, র্যাবের অভিযানে ভুয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণের সময় স্বর্ণ ও ডলার চোরাচালান চক্রের একজন সদস্য এবং অপহরণকারী চক্রের মূল হোতা এএসআই ফজিকুল ও চার সদস্য আটক।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি: ওই দিন র্যাবের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার র্যাবের একটি গোয়েন্দা দল জানতে পারে, যশোর থেকে ঈগল পরিবহন বাসে খোকন ও সামছুল নামের দুজন সাবেক চেয়ারম্যান সবুরের একটি ডলারের চালান নিয়ে ঢাকায় আসবেন। কিন্তু খোকন বিশ্বাসঘাতকতা করে ওই ডলারের চালানটি একটি অপহরণকারী দলের মাধ্যমে ছিনতাই করাবে। এরই ধারাবাহিকতায় র্যাব-৪-এর একটি দল শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টায় সাভার এলাকায় অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। সামছুল ও খোকন ইতিমধ্যে পাটুরিয়া ঘাটে ঈগল পরিবহন থেকে নেমে অন্য একটি বাসে ঢাকার দিকে রওনা দেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁরা সাভার বাসস্ট্যান্ডে নেমে যান। এরপর তাঁরা আশুলিয়া যাওয়ার জন্য রাস্তা অতিক্রম করে সিটি সেন্টারের সামনে যান।
সামছুল এ সময় আশুলিয়া যাওয়ার জন্য একটি লোকাল বাসে ওঠেন। রেজাউল, ফজিকুল ও তাঁর সহযোগীরা ওই বাসে উঠে সামছুলকে অপহরণ করে নিচে নামিয়ে আনেন। এ পর্যায়ে ওই চক্রের একজন সদস্য সামছুলের কাছ থেকে ডলারের প্যাকেটটি কেড়ে নেন। এ সময় র্যাবের দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপহরণকারী চক্রের চারজনসহ চোরাচালানকারী সামছুলকে আটক করে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক সদস্যদের ধরার জন্য র্যাব তাঁদের পিছু নেয়। কিছুক্ষণ পরে ক্যাপ্টেন নাহিদের ফোন থেকে র্যাবকে জানানো হয়, তিনি সাভার থেকে আট কিলোমিটার দূরে রিয়াদ গ্যারেজের কাছাকাছি আহত অবস্থায় রাস্তার পাশে পড়ে আছেন। তাঁকে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মামলায় যা আছে: আশুলিয়ার নবীনগর এলাকায় কর্তব্য পালনের সময় র্যাব সদস্যরা শুক্রবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে জানতে পারেন, সাভারের সোবাহানবাগ এলাকায় সিটি সেন্টারের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিম পাশে কতিপয় দুষ্কৃতকারী ভুয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে অপরাধ করার জন্য অবস্থান করছেন। খবর পেয়ে র্যাব সদস্যরা রাত পৌনে চারটার দিকে সেখানে অভিযান চালিয়ে এএসআই ফজিকুল ইসলাম, রেজাউল হক, সুজন শেখ, মিরান খান, সামছুল হক ও আবদুস সবুরকে আটক করেন। এ সময় খোকন নামের একজন পালিয়ে যান।
গ্রেপ্তারের সময় আবদুস সবুর রড দিয়ে র্যাব কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নাহিদ আল-আমিনকে আঘাত করলে তাঁর মাথা ফেটে যায় এবং ডান চোয়াল থেঁতলে যায়। তাঁর দুটি দাঁত ভেঙে যায়। তাঁকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকার সমিঞ্চলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নথি ও ব্যবস্থাপত্রে দেখা যায়, ক্যাপ্টেন নাহিদকে ভর্তি করা হয় শুক্রবার রাত ১১টা ১০ মিনিটে। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত (আরটিএ) হন বলে ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের অভিযোগ: সামছুল হককে সাভার থানায় আনা হলে তিনি বলেন, ‘আমি সাতক্ষীরাসহ সীমান্তবর্তী জেলা থেকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ডলার বহন করে সাভার ও রাজধানীর ব্যবসায়ীদের পৌঁছে দিই। শুক্রবার সাতক্ষীরা থেকে ১৪ হাজার ৬৫০ আমেরিকান ডলার নিয়ে ঈগল পরিবহনের একটি বাসে এসে রাত নয়টার দিকে সাভার বাসস্ট্যান্ডের অদূরে সিটি সেন্টারের সামনে নামি। সেখান থেকে সাভার-আশুলিয়ার বাসে উঠতে গেলে রেজাউল ও মিরান আমাকে নামতে বাধ্য করেন। এ সময় সাদাপোশাকে র্যাব সদস্যরা আমাদের ঘেরাও করে আমার পায়ে বাঁধা থাকা ডলার নিয়ে নেন।’
এএসআই ফজিকুল বলেন, ‘ডলার আসার খবর পেয়ে রাত নয়টার দিকে আমি সাদাপোশাকে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যাই। ডলারসহ সামছুলকে বাস থেকে নামানোর পরপরই র্যাব সদস্যরা আমাদের ঘিরে ফেলেন। আমি পরিচয় দেওয়ার পরও র্যাব আমাদের আটক করে।’
পুলিশ কর্মকর্তারা যা বলেন: সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল বলেন, তথ্যদাতার (সোর্স) মাধ্যমে খবর পেয়ে আমাকেসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এএসআই ফজিকুল সোর্স নিয়ে শুক্রবার রাত নয়টার দিকে সিটি সেন্টারের সামনে যান। সামছুল হক বাস থেকে নামলে ফজিকুল ও তাঁর সোর্স তাকে আটক করার চেষ্টা করে। কিন্তু একই সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে র্যাব সদস্যরাও সেখানে উপস্থিত হয় এবং সবাইকে আটক করে।
ওসি বলেন, এএসআই ফজিকুলের মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আহত হন র্যাবের ক্যাপ্টেন নাহিদ। তখন রাত ১০টা। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করেন। বিষয়টি র্যাবকে জানানো হলে তারা তাঁকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য: ভাকুর্তা সেতুর পাশের রিয়াদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মিস্ত্রি কবীর হোসেন বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০টার দিকে মাথা ও মুখে আঘাত লাগা এক লোককে সড়কের ওপর পড়ে কাতরাতে দেখি। তাঁকে উদ্ধার করে ওয়ার্কশপে নিয়ে যাই। তাঁর মুঠোফোন থেকে ফোন করে জানতে পারি তিনি র্যাবের কর্মকর্তা। পরে র্যাবের লোকজন এসে তাঁকে হাসপাতালে নেন।’
র্যাব কর্মকর্তার বক্তব্য: র্যাব-৪ সাভার ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে পুলিশ ও আসামিদের অভিযোগ সত্য নয়। র্যাব কোনো ডলার উদ্ধার করতে পারেনি। অভিযানের সময় খোকন নামের এক ব্যক্তি ডলার নিয়ে সটকে পড়েন। তিনি বলেন, আসামিদের রডের আঘাতেই ক্যাপ্টেন নাহিদ আহত হন, সড়ক দুর্ঘটনায় নয়।
সর্বশেষ: মামলার তদন্তভার র্যাবকে দেওয়ার জন্য গত রোববার অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মো. সামসুর রহমান ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শহীদুল ইসলামের আদালতে আবেদন করেছেন।
0 comments:
Post a Comment