
আজ ৭ জানুয়ারি
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের অনন্তপুর হাজীটারী সীমান্তের
৯৪৭/৩ এস আন্তর্জাতিক পিলার সংলগ্ন ভারতের খেতাবেরকুটি গ্রামে বিশ্ব
তোলপাড় করা ঘটনা পাষণ্ড বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানী হত্যা
ট্র্যাজেডির তৃতীয় বর্ষপূর্তি। এ উপলক্ষে ফেলানীর রূহের মাগফিরাতে আজ
ফেলানীর বাড়ি পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা গ্রামে
পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। এতে উপস্থিত
থাকবেন ফেলানীর স্বজন ও এলাকাবাসী।
২০১১ সালের এই দিনে কিশোরী ফেলানী বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে যাওয়া অভাবি বাবাসহ সুদূর আসাম রাজ্যের বনগাইগাঁও এলাকা থেকে দেশের বাড়ি ফেরার পথে ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ কর্তৃক পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার শিকার হয়। বিএসএফ সদস্যরা তাকে নির্যাতন শেষে পাখি শিকারের মতো গুলি চালিয়ে হত্যা করে তার লাশ ঝুলে রাখে কাঁটাতারের বেড়ায়। ৯ জানুয়ারি দুদিন পর তার লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। এ খবরটি ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট প্রকাশসহ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় ফলাও হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সর্বত্র। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে মিছিল-মিটিং-মানববন্ধন হয়। ফেলানীর বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে দাফন করা ফেলানীর কবর দেখতে ও তার পরিবারকে সান্ত্বনা এবং আর্থিক সাহায্য দিতে ছুটে আসে বাংলাদেশ সরকারের তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা। সরকারিভাবে জানানো হয় ভারতকে বিএসএফের এ নির্মমতার প্রতিবাদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ফেলানীর পরিবারের কাছে নগদ তিন লাখ টাকা, পেট্রিয়ট অব বাংলাদেশের পক্ষে এক লাখ টাকা, ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার পক্ষে ৫০ হাজার টাকা নগদ অনুদান দেয়াসহ ফেলানীর বাবা নূর ইসলামকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্থানীয় রামখানা বাজারে ‘ফেলানী স্টোর’ নামে একটি আধা-পাকা দোকান ঘর অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়।
ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি এখনও অপূরণীয়
ফেলানী হত্যার তিন বছর অতিবাহিত হলেও ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি এখনও অপূরণীয় রয়েছে। ফেলানীর পরিবারকে দেয়া তত্কালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মুখ এখনও দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ফেলানী হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও এখনও অভিযুক্ত বিএসএফের শাস্তি দেখছে না ফেলানীর পরিবার। এছাড়া ভারত সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ, ফেলানীর কবর পাকা করা, ফেলানীর বাড়ির সামনের প্রায় আড়াই কিমি কাঁচা রাস্তা পাকা করা ও রাস্তাটি ফেলানী সড়ক নামকরণ, তার বাড়ির পাশের কলোনিটারী মসজিদটিকে পাকা করার দাবির বাস্তবায়ন পায়নি ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসী। এসব দ্রুত বাস্তবায়ননের দাবি করেছেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম, মা জাহানারা বেগমসহ এলাকাবাসী।
ফেলানী হত্যা ও তার বাবার ভারত যাওয়ার কারণ
ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম (৩৫) জানান, বাবা হাফেজ আলীর মৃত্যুর পর তার বয়স যখন ৯-১০ বছর, তখন অভাবের তাড়নায় নাগেশ্বরীর দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী থেকে বিধবা মা আলীজনের সঙ্গে তিনি এবং তার ছোট ভাই আব্দুল খলিল ভারতের জলপাইগুড়িতে কাজের খোঁজে যান। ওই সময় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। জলপাইগুড়িতে তারা বেশ কিছুদিন থাকেন। এর মধ্যে মা আলীজন বিবির মৃত্যু হলে তাকে জলপাইগুড়িতে কবর দেয়া হয়। মায়ের মৃত্যুর পর অভাব তাদের মাঝে গ্রাস করলে দুই ভাই দু’দিকে কাজের সন্ধানে বের হন। বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে ভারতের আলীপুরে ফেলানীর মা জাহানারা বেগমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। জাহানারা একইভাবে অভাবের তাড়নায় তার দাদীর সঙ্গে আলীপুরে থাকত। নূর ইসলামের গ্রামের বাড়ির পার্শ্ববর্তী গ্রাম দক্ষিণ রামখানা বানারভিটার বাসিন্দা জাহানারা হওয়ায় প্রতিবেশী সম্পর্কে এক পর্যায় নূর ইসলাম ও জাহানারা বেগমের বিয়ে হয়। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে দুই মেয়ে সন্তান জন্ম নিলেও সন্তান দুটি জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনে আলীপুর ছেড়ে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার নিউ বংগাইগাঁও ভাওলাগুড়িতে চলে যান। সেখানে জন্ম হয় ফেলানীর। দুই মেয়ে সন্তানের মৃত্যুর মতো ফেলানীরও মৃত্যু হতে পারে, এই আশঙ্কায় তার নাম রাখা হয় ফেলানী। পরে ফেলানীসহ আরও ৫ সন্তানের জন্ম হয়। এরা হলো মালেকা খাতুন, জাহান উদ্দিন, আরফান আলী, আক্কাস আলী ও কাজলী খাতুন। নিউ বংগাইগাঁও ভাওলাগুড়িতে একটি মুদির দোকান দিয়ে তাদের ৩ মেয়ে, ৩ ছেলে ও স্বামী-স্ত্রী মিলে পরিবারের ৮ সদস্যের সুখের সংসার চলছিল। অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলে দেশে ফিরে আসবেন এই আশায় তারা আসামের নাগরিকত্বের সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। নূর ইসলাম দেশে আসবেন বলে বাংলাদেশের ভোটার হন। জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন তিনি। ভোটের সময় এলে আসাম থেকে এসে এখানকার স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ভোট প্রয়োগ করতেন তিনি। এর মধ্যে মেয়ে ফেলানী বড় হয়ে উঠলে তাকে বাংলাদেশে বিয়ে দেবেন এই পরিকল্পনা নেন তারা। শাশুড়ি হাজেরা বিবির সম্মতিক্রমে ছোট্টবেলায় কথা দেয়া স্ত্রী জাহানারা বেগমের আপন বড় বোন লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরকুলাঘাট গ্রামের ইদ্রিস আলী ও তার স্ত্রী আনজিনা বেগমের বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়। নূর ইসলাম আসাম থেকে এসে আমজাদ হোসেনের মায়ের সঙ্গে আলাপ করে ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বিয়ের দিন ধার্য করেন। ৯ জানুয়ারি বিয়ের দিন ধার্য অনুযায়ী মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নূর ইসলাম আসাম থেকে রওনা দেন বাংলাদেশের উদ্দেশে। ফেলানীর মা জাহানারা বেগম মেয়েকে নিজ হাতে সাজিয়ে দেন। পরিয়ে দেন হাত, গলা, কান, নাকে ও পায়ে স্বর্ণ এবং রুপার অলঙ্কার। হবু জামাই আমজাদ হোসেনের জন্য দুটি আংটি, একটি চেইনসহ মেয়ের হাত খরচের নগদ ১ হাজার ৯০০ (ভারতীয়) টাকা সঙ্গে দেন। ফেলানীও তার হবু জীবন সঙ্গীর জন্য একটি রুমাল, কিছু গিফ্টসামগ্রী নিয়ে বাবার সঙ্গে আসে। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে তারা রাত ৮টার দিকে আসাম থেকে চৌধুরীহাট বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে ভারতীয় চৌধুরীহাট খেতাবেরকুটি সীমান্তবর্তী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে দালাল মোশারফ হোসেন ও দালাল বুর্জত আলীসহ ৩-৪ জন দালাল তাদের পিছু নেয়। দালালরা তাদের কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা চুক্তি করে। দালাল মোশারফকে চুক্তির টাকা দেয়ার সময় ফেলানীর বাবা দালালের কাছে প্রতিশ্রুতি নেন তার মেয়ের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তার কথামত দালাল মোশারফ ক্ষতি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আশ্বস্ত হন ফেলানীর বাবা। পরে রাত ৯টার দিকে দালাল মোশারফ হোসেন ফেলানী ও বাবাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে কাঁটাতার বেড়া পার করে দেয়ার অজুহাতে দালাল মোশারফ ফেলানী ও তার বাবাকে আরও ৩-৪টি বাড়িতে আনা-নেয়া করে। রাত ৯টা থেকে গভীর রাত ৩-৪টা পর্যন্ত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে টানা-হিঁচড়া করায় ফেলানী একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেও তা পায়নি। নির্ঘুম রাত কাটানো ও টানা-হিঁচড়ায় ক্লান্ত ফেলানী ও তার বাবাকে ৭ জানুয়ারি ভোররাতে ফজরের আজানের সময় ফুলবাড়ীর অনন্তপুর হাজীটারী সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ৯৪৭/৩এস-এর পাশে ভারতের অভ্যন্তরের চৌধুরীহাট খেতাবেরকুটি এলাকায় নিয়ে আসে দালালরা। ওই এলাকায় কাঁটাতারের ৩ স্তরের বেড়া পার হতে বাঁশের তৈরি ৩টি মই কাঁটাতারের বেড়ায় লাগানো হয়। সেই মই বেয়ে প্রথমে নূর ইসলাম পরে মেয়ে ফেলানী পার হওয়ার সময় চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ তাদের পিছু নেয়। নূর ইসলাম জানান, মই বেয়ে পার হওয়ার সময় ২-৩ জন বিএসএফকে তিনি মইয়ের উপর উঠতে দেখেন। এক সময় একটি গুলির শব্দ হলে নূর ইসলাম ভয়ে পড়ে যান কাঁটাতারের বাইরে। তখন মেয়ে ফেলানী ছিল কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে। কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে ভারত ভূখণ্ডে পড়ে যাওয়া নূর ইসলাম তড়িঘড়ি উঠে ফেলানীকে তাড়াতাড়ি কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে আসার জন্য বলেন। কিন্তু কীভাবে ফেলানী মারা গেল তা তিনি ঝুঝতে পারেননি। নূর ইসলাম বলেন, কাঁটাতারের মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেলানীকে গুলি করলে সে কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে পড়ে থাকত, কিন্তু কীভাবে কাঁটাতারের বেড়ার শেষ প্রান্তে ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকল এটা তাকে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। নূর ইসলাম একটি গুলির শব্দ শুনলেও তিনি আরও একটি কম আওয়াজের গুলি হয়েছে বলে পরে মানুষের কাছে শুনেছেন। এতে ধারণা হয় ফেলানীর বাবাকে ভয় দেখানোর জন্য একটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছিল। হাজীটারী সীমান্তের বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, গোলজার হোসেনসহ আরও অনেকে জানান, ফেলানীকে যেভাবে কাঁটাতারের শেষ প্রান্তে আটকে রাখা হয়েছে তা পরিকল্পিত। ফেলানীকে নির্যাতন করে হত্যার পর কাঁটাতারে বেড়ায় ঝুলে রাখা হয়েছে এমন শতভাগ ধারণা করেছেন তারা। ৭ জানুয়ারির ভোর থেকে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলেছিল ফেলানীর লাশ। ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম মেয়ের হত্যার কথা শুনে সংজ্ঞাহীন হন। সাড়ে ১০টার দিকে ফেলানীর মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার। ওইদিন কুড়িগ্রাম বিজিবির তত্কালীন ২৭ ব্যাটালিয়নের কাশিপুর কোম্পানির পক্ষ থেকে লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে পত্র দেয়া হলে ফেলানীর লাশ পোস্টমর্টেম শেষে পরের দিন ৮ জানুয়ারি সকাল ১১টায় ওই সীমান্তে বিজিবি কাশিপুর কোম্পানি ও বিএসএফ চৌধুরীহাট কোম্পানির পর্যায় পতাকা বৈঠকে বিজিবিকে লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। পরে বাংলাদেশে ফেলানীর দ্বিতীয় দফায় পোস্টমর্টেম শেষে ৯ জানুয়ারি রাতে তার পরিবারের কাছে ফুলবাড়ী থানার পুলিশ লাশ হস্তান্তর করলে ওই রাতেই কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীকে দাফন করা হয়।
২০১১ সালের এই দিনে কিশোরী ফেলানী বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য অভাবের তাড়নায় কাজের সন্ধানে যাওয়া অভাবি বাবাসহ সুদূর আসাম রাজ্যের বনগাইগাঁও এলাকা থেকে দেশের বাড়ি ফেরার পথে ভারতের চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ কর্তৃক পাশবিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যার শিকার হয়। বিএসএফ সদস্যরা তাকে নির্যাতন শেষে পাখি শিকারের মতো গুলি চালিয়ে হত্যা করে তার লাশ ঝুলে রাখে কাঁটাতারের বেড়ায়। ৯ জানুয়ারি দুদিন পর তার লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। এ খবরটি ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে রিপোর্ট প্রকাশসহ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় ফলাও হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সর্বত্র। বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে মিছিল-মিটিং-মানববন্ধন হয়। ফেলানীর বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী গ্রামে দাফন করা ফেলানীর কবর দেখতে ও তার পরিবারকে সান্ত্বনা এবং আর্থিক সাহায্য দিতে ছুটে আসে বাংলাদেশ সরকারের তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা। সরকারিভাবে জানানো হয় ভারতকে বিএসএফের এ নির্মমতার প্রতিবাদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ফেলানীর পরিবারের কাছে নগদ তিন লাখ টাকা, পেট্রিয়ট অব বাংলাদেশের পক্ষে এক লাখ টাকা, ‘দৈনিক আমার দেশ’ পত্রিকার পক্ষে ৫০ হাজার টাকা নগদ অনুদান দেয়াসহ ফেলানীর বাবা নূর ইসলামকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের পক্ষে স্থানীয় রামখানা বাজারে ‘ফেলানী স্টোর’ নামে একটি আধা-পাকা দোকান ঘর অনুদান হিসেবে প্রদান করা হয়।
ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি এখনও অপূরণীয়
ফেলানী হত্যার তিন বছর অতিবাহিত হলেও ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি এখনও অপূরণীয় রয়েছে। ফেলানীর পরিবারকে দেয়া তত্কালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মুখ এখনও দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে ফেলানী হত্যার বিচার কার্যক্রম শুরু হলেও এখনও অভিযুক্ত বিএসএফের শাস্তি দেখছে না ফেলানীর পরিবার। এছাড়া ভারত সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ, ফেলানীর কবর পাকা করা, ফেলানীর বাড়ির সামনের প্রায় আড়াই কিমি কাঁচা রাস্তা পাকা করা ও রাস্তাটি ফেলানী সড়ক নামকরণ, তার বাড়ির পাশের কলোনিটারী মসজিদটিকে পাকা করার দাবির বাস্তবায়ন পায়নি ফেলানীর পরিবার ও এলাকাবাসী। এসব দ্রুত বাস্তবায়ননের দাবি করেছেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম, মা জাহানারা বেগমসহ এলাকাবাসী।
ফেলানী হত্যা ও তার বাবার ভারত যাওয়ার কারণ
ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম (৩৫) জানান, বাবা হাফেজ আলীর মৃত্যুর পর তার বয়স যখন ৯-১০ বছর, তখন অভাবের তাড়নায় নাগেশ্বরীর দক্ষিণ রামখানা কলোনিটারী থেকে বিধবা মা আলীজনের সঙ্গে তিনি এবং তার ছোট ভাই আব্দুল খলিল ভারতের জলপাইগুড়িতে কাজের খোঁজে যান। ওই সময় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। জলপাইগুড়িতে তারা বেশ কিছুদিন থাকেন। এর মধ্যে মা আলীজন বিবির মৃত্যু হলে তাকে জলপাইগুড়িতে কবর দেয়া হয়। মায়ের মৃত্যুর পর অভাব তাদের মাঝে গ্রাস করলে দুই ভাই দু’দিকে কাজের সন্ধানে বের হন। বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে ভারতের আলীপুরে ফেলানীর মা জাহানারা বেগমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। জাহানারা একইভাবে অভাবের তাড়নায় তার দাদীর সঙ্গে আলীপুরে থাকত। নূর ইসলামের গ্রামের বাড়ির পার্শ্ববর্তী গ্রাম দক্ষিণ রামখানা বানারভিটার বাসিন্দা জাহানারা হওয়ায় প্রতিবেশী সম্পর্কে এক পর্যায় নূর ইসলাম ও জাহানারা বেগমের বিয়ে হয়। স্বামী-স্ত্রীর সংসারে দুই মেয়ে সন্তান জন্ম নিলেও সন্তান দুটি জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রী দু’জনে আলীপুর ছেড়ে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার নিউ বংগাইগাঁও ভাওলাগুড়িতে চলে যান। সেখানে জন্ম হয় ফেলানীর। দুই মেয়ে সন্তানের মৃত্যুর মতো ফেলানীরও মৃত্যু হতে পারে, এই আশঙ্কায় তার নাম রাখা হয় ফেলানী। পরে ফেলানীসহ আরও ৫ সন্তানের জন্ম হয়। এরা হলো মালেকা খাতুন, জাহান উদ্দিন, আরফান আলী, আক্কাস আলী ও কাজলী খাতুন। নিউ বংগাইগাঁও ভাওলাগুড়িতে একটি মুদির দোকান দিয়ে তাদের ৩ মেয়ে, ৩ ছেলে ও স্বামী-স্ত্রী মিলে পরিবারের ৮ সদস্যের সুখের সংসার চলছিল। অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলে দেশে ফিরে আসবেন এই আশায় তারা আসামের নাগরিকত্বের সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। নূর ইসলাম দেশে আসবেন বলে বাংলাদেশের ভোটার হন। জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন তিনি। ভোটের সময় এলে আসাম থেকে এসে এখানকার স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনগুলোতে ভোট প্রয়োগ করতেন তিনি। এর মধ্যে মেয়ে ফেলানী বড় হয়ে উঠলে তাকে বাংলাদেশে বিয়ে দেবেন এই পরিকল্পনা নেন তারা। শাশুড়ি হাজেরা বিবির সম্মতিক্রমে ছোট্টবেলায় কথা দেয়া স্ত্রী জাহানারা বেগমের আপন বড় বোন লালমনিরহাট জেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের চরকুলাঘাট গ্রামের ইদ্রিস আলী ও তার স্ত্রী আনজিনা বেগমের বড় ছেলে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপার চূড়ান্ত করা হয়। নূর ইসলাম আসাম থেকে এসে আমজাদ হোসেনের মায়ের সঙ্গে আলাপ করে ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বিয়ের দিন ধার্য করেন। ৯ জানুয়ারি বিয়ের দিন ধার্য অনুযায়ী মেয়ে ফেলানীকে নিয়ে ৬ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নূর ইসলাম আসাম থেকে রওনা দেন বাংলাদেশের উদ্দেশে। ফেলানীর মা জাহানারা বেগম মেয়েকে নিজ হাতে সাজিয়ে দেন। পরিয়ে দেন হাত, গলা, কান, নাকে ও পায়ে স্বর্ণ এবং রুপার অলঙ্কার। হবু জামাই আমজাদ হোসেনের জন্য দুটি আংটি, একটি চেইনসহ মেয়ের হাত খরচের নগদ ১ হাজার ৯০০ (ভারতীয়) টাকা সঙ্গে দেন। ফেলানীও তার হবু জীবন সঙ্গীর জন্য একটি রুমাল, কিছু গিফ্টসামগ্রী নিয়ে বাবার সঙ্গে আসে। দীর্ঘ ৮ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে তারা রাত ৮টার দিকে আসাম থেকে চৌধুরীহাট বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছলে ভারতীয় চৌধুরীহাট খেতাবেরকুটি সীমান্তবর্তী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে দালাল মোশারফ হোসেন ও দালাল বুর্জত আলীসহ ৩-৪ জন দালাল তাদের পিছু নেয়। দালালরা তাদের কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেয়ার জন্য ৩ হাজার টাকা চুক্তি করে। দালাল মোশারফকে চুক্তির টাকা দেয়ার সময় ফেলানীর বাবা দালালের কাছে প্রতিশ্রুতি নেন তার মেয়ের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। তার কথামত দালাল মোশারফ ক্ষতি না হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আশ্বস্ত হন ফেলানীর বাবা। পরে রাত ৯টার দিকে দালাল মোশারফ হোসেন ফেলানী ও বাবাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে কাঁটাতার বেড়া পার করে দেয়ার অজুহাতে দালাল মোশারফ ফেলানী ও তার বাবাকে আরও ৩-৪টি বাড়িতে আনা-নেয়া করে। রাত ৯টা থেকে গভীর রাত ৩-৪টা পর্যন্ত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে টানা-হিঁচড়া করায় ফেলানী একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেও তা পায়নি। নির্ঘুম রাত কাটানো ও টানা-হিঁচড়ায় ক্লান্ত ফেলানী ও তার বাবাকে ৭ জানুয়ারি ভোররাতে ফজরের আজানের সময় ফুলবাড়ীর অনন্তপুর হাজীটারী সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলার ৯৪৭/৩এস-এর পাশে ভারতের অভ্যন্তরের চৌধুরীহাট খেতাবেরকুটি এলাকায় নিয়ে আসে দালালরা। ওই এলাকায় কাঁটাতারের ৩ স্তরের বেড়া পার হতে বাঁশের তৈরি ৩টি মই কাঁটাতারের বেড়ায় লাগানো হয়। সেই মই বেয়ে প্রথমে নূর ইসলাম পরে মেয়ে ফেলানী পার হওয়ার সময় চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ তাদের পিছু নেয়। নূর ইসলাম জানান, মই বেয়ে পার হওয়ার সময় ২-৩ জন বিএসএফকে তিনি মইয়ের উপর উঠতে দেখেন। এক সময় একটি গুলির শব্দ হলে নূর ইসলাম ভয়ে পড়ে যান কাঁটাতারের বাইরে। তখন মেয়ে ফেলানী ছিল কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে। কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে ভারত ভূখণ্ডে পড়ে যাওয়া নূর ইসলাম তড়িঘড়ি উঠে ফেলানীকে তাড়াতাড়ি কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে আসার জন্য বলেন। কিন্তু কীভাবে ফেলানী মারা গেল তা তিনি ঝুঝতে পারেননি। নূর ইসলাম বলেন, কাঁটাতারের মাঝখানে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফেলানীকে গুলি করলে সে কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে পড়ে থাকত, কিন্তু কীভাবে কাঁটাতারের বেড়ার শেষ প্রান্তে ফেলানীর লাশ ঝুলে থাকল এটা তাকে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। নূর ইসলাম একটি গুলির শব্দ শুনলেও তিনি আরও একটি কম আওয়াজের গুলি হয়েছে বলে পরে মানুষের কাছে শুনেছেন। এতে ধারণা হয় ফেলানীর বাবাকে ভয় দেখানোর জন্য একটি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়েছিল। হাজীটারী সীমান্তের বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, গোলজার হোসেনসহ আরও অনেকে জানান, ফেলানীকে যেভাবে কাঁটাতারের শেষ প্রান্তে আটকে রাখা হয়েছে তা পরিকল্পিত। ফেলানীকে নির্যাতন করে হত্যার পর কাঁটাতারে বেড়ায় ঝুলে রাখা হয়েছে এমন শতভাগ ধারণা করেছেন তারা। ৭ জানুয়ারির ভোর থেকে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলেছিল ফেলানীর লাশ। ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম মেয়ের হত্যার কথা শুনে সংজ্ঞাহীন হন। সাড়ে ১০টার দিকে ফেলানীর মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার। ওইদিন কুড়িগ্রাম বিজিবির তত্কালীন ২৭ ব্যাটালিয়নের কাশিপুর কোম্পানির পক্ষ থেকে লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে পত্র দেয়া হলে ফেলানীর লাশ পোস্টমর্টেম শেষে পরের দিন ৮ জানুয়ারি সকাল ১১টায় ওই সীমান্তে বিজিবি কাশিপুর কোম্পানি ও বিএসএফ চৌধুরীহাট কোম্পানির পর্যায় পতাকা বৈঠকে বিজিবিকে লাশ ফেরত দেয় বিএসএফ। পরে বাংলাদেশে ফেলানীর দ্বিতীয় দফায় পোস্টমর্টেম শেষে ৯ জানুয়ারি রাতে তার পরিবারের কাছে ফুলবাড়ী থানার পুলিশ লাশ হস্তান্তর করলে ওই রাতেই কলোনিটারী গ্রামে ফেলানীকে দাফন করা হয়।
প্রথম পাতা
0 comments:
Post a Comment