আজ সকালে রাজধানীর আসাদগেটে মতিঝিলগামী বেসরকারি অফিসের চাকুরে রুনা খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিরোধী দলের নেতারা হরতাল-অবরোধ ডেকে বাসায় ঘুমাচ্ছেন। আর আমাদেরকে অফিসে যাওয়ার জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে। আর রাস্তায় বেরোলে কখন শরীরে ককটেল বা পেট্রলবোমা পড়ে, সেই আতঙ্কে থাকি। আতঙ্কিত জীবন কাটানো ছাড়া তো আমাদের কোনো উপায় নেই।’
১৮-দলীয় জোটের ডাকা অবিরাম অবরোধ কর্মসূচির অষ্টম দিন এবং হরতালের পঞ্চম দিনে জনজীবনের অবস্থা দেখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশ ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে হরতাল-অবরোধ। আতঙ্ক থাকলেও জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও অফিস-আদালত খোলা থাকায় কর্মজীবী মানুষ বেরিয়েছেন কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে। রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
সকাল থেকেই প্রচুর যানবাহন চলছে রাস্তায়। তবে এটা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম। ব্যক্তিগত যানবাহনও ছিল অনেক। তবে ভিআইপি রোডসহ রাজধানীর অধিকাংশ রাস্তা ছিল রিকশার দখলে। সকাল থেকেই অফিসগামী যাত্রীরা রাস্তায় বেরিয়েছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষও রাস্তায় বেরিয়েছেন প্রয়োজনীয় কাজ সারতে। রাজধানীর বিপণিবিতানগুলো খোলা থাকলেও ক্রেতা কম। গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালী থেকে ছেড়ে যায়নি দূরপাল্লার যানবাহন।
মতিঝিলে সোনালী ব্যাংক ভবনের সামনে কথা হলো ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের সঙ্গে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি নিজের ক্ষোভের কথা জানালেন তিনি। বললেন, ‘নির্বাচন হয়েছে। সরকার গঠন হবে। বিরোধী দল গতানুগতিক হরতাল-অবরোধের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। সরকার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে কঠোর হবে। বিএনপি নেতাদের ধরছে, ছাড়ছে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে বড় নাশকতার অভিযোগ উঠছে, সেই জামায়াতের কাউকে গ্রেপ্তার করতে দেখছি না।’
একই জায়গায় আরেক ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়লেন। বললেন, ‘নতুন বছরের এক সপ্তাহ চলে গেল। কিন্তু এখনো স্কুলে ক্লাস শুরু করা যায়নি। কবে শুরু হবে, সেটাও জানি না। এভাবে কত দিন চলবে?’
আসাদগেটে কথা হলো ব্যাংকার সাজিয়া ইসলামের সঙ্গে। তাঁর অফিস গুলশানে। বললেন, ‘ভোগান্তি তো প্রতিদিনের। গাড়ি কম হওয়ায় ভিড় প্রচুর। বাসের পরিবর্তে রিকশায় যেতে হয় অফিসে। প্রতিদিনই বাড়তি ভাড়া গুনতে গুনতে জীবন শেষ।’
ধানমন্ডির জেনেটিক প্লাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘অবরোধের মধ্যেও মার্কেট খোলা রয়েছে। কিন্তু ক্রেতা নেই। তার পরও ক্রেতার আশায় আমাদের খোলা রাখতে হচ্ছে। মালিকেরা এখনো কর্মচারীদের ডিসেম্বরের বেতন দিতে পারেননি। কবে দিতে পারবেন, সেটাও জানা নেই।’
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ফুটপাতের দোকানি কামাল হোসেন বললেন, ‘বেচাকেনা খুবই কম। শীতের কাপড়-চোপড় কিছুটা বিক্রি হচ্ছে। কাস্টমাররাও বুঝে গেছেন আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। তাই অনেক দামাদামি করেন। বাধ্য হয়েই কিছুটা পড়তা হইলেই ছাইড়া দেই।’
প্রেসক্লাবের সামনে মিরপুর যেতে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন তানিম হাসান। অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গেই তিনি বলেন, ‘নেতারা যেভাবে জনগণকে জিম্মি করে রেখেছেন, এ থেকে উত্তরণের উপায় নেই। যতক্ষণ জনগণ দুই পক্ষকেই প্রতিহত করা শুরু না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্তি নেই।’
নগর পরিবহনের কাউন্টারগুলো টিকিট বিক্রেতাশূন্য। যাত্রী থাকলেও গাড়ির সংখ্যা কম। গাড়ির ভেতরেই ভাড়ার টাকা নেওয়া হচ্ছে। রাস্তায় বিআরটিসির বাস রয়েছে প্রচুর সংখ্যায়।
দূরপাল্লার যানবাহনের টিকিট কাউন্টারগুলো ছিল যাত্রীশূন্য। পরিবহন কাউন্টারগুলোতে কথা বলে জানা গেছে, ‘নিরাপত্তাজনিত কারণে’ তাঁরা গাড়ি ছাড়ছেন না।
তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থান।
১ জানুয়ারি থেকে অবিরাম অবরোধ কর্মসূচির মধ্যেই ৪ জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের হরতাল চলছে।
0 comments:
Post a Comment