স্টালিন
সরকার : প্রার্থী আর ভোটারবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘অগ্রহণযোগ্য’
হিসেবে অবিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে আন্তর্জাতিক মহল। তারা বলেছেন,
ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন না ঘটায় বাংলাদেশের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি।
একই সঙ্গে তারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে সংকট
সমাধান করে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতের কিছু
মিডিয়া ছাড়া বিশ্বের প্রভাবশালী সব মিডিয়ার প্রায় একই মূল্যায়ন। ওইসব
মিডিয়া সব দলের অংশগ্রহণে ‘প্রকৃত নির্বাচনের’ দাবি জানিয়েছে। জাতিসংঘ,
কমনওয়েলথ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ ও
সংস্থাগুলো পাতানো নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি উল্লেখ করে
সহিংসতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। তবে ব্যতিক্রম শুধু ভারত। দিল্লী এ
নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে অবিহিত করেছে; যেমন করেছিল
১৯৭৪ সালে সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসসিসি) নির্বাচনে লেন্দুপ দর্জিকে। ওই
নির্বাচনে এসসিসির ৩২ আসনের মধ্যে লেন্দুপ দর্জির দল ৩১ আসনে বিজয়ী হয়েছিল।
সে সময় সিমিকের কিছু বুদ্ধিজীবী এসসিসি নির্বাচনের সাংবিধানিক
বাধ্যবাধকতার কারণ দেখিয়ে গ্রহণযোগ্য হিসেবে দাবি করেছিল। ঠিক সে রকমই
এদেশের কিছু বুদ্ধিজীবী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিকল্প নেই ধুঁয়া তুলে
উল্টো নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় আন্দোলনরত ১৮ দলকে দোষারোপ করছে। দশম জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে কাকতালীয়ভাবে আওয়ামী লীগ ২৩১ আসনে বিজয়ী হয়েছে।
বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। দলের সভাপতিম-লীর সদস্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কঠোর থেকে নরম সুর করেছেন। বলেছেন, নির্বাচন সর্বজন গ্রহণযোগ্য হয়নি। আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডিস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলার নেতা ও ঢাকা অঞ্চলের নতুন সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, নির্বাচন পাঁচ বছরের জন্য হলেও আমরা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবো একথা বলছি না। বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে নতুন নির্বাচন হতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ একটি নতুন নির্বাচনের কথা বলছেন।
আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে আওয়ামী লীগের মুখপত্র সুর নরম করলেও আওয়ামী লীগপন্থী বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচনকে শেখ হাসিনার ‘সফলতা’ হিসেবে অবিহিত করছেন। প্লট, ফ্ল্যাট, বিশেষ সুবিধা, চাকরি (বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রাষ্ট্রদূত, ব্যাংক-বীমার পরিচালক, দপ্তর-কর্পোরেশনের দায়িত্ব ইত্যাদি), বদলি বাণিজ্যে আর্থিক উন্নতির মাধ্যমে ৫ বছরে যারা ফুলে ফেপে উঠেছেন ভোটের পর তারা কোমড় বেঁধে মাঠে নেমেছেন। সামগ্রিক বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনের টকশো, আলোচনা, সভা-সেমিনারে তারা ‘দাঁত কেলিয়ে হাসছেন’ এবং শেখ হাসিনাকে নমনীয় না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করে তারা দিল্লীর ভূমিকার প্রশংসা করছেন। নির্বাচন কমিশনের রহস্যজনক ভূমিকা এবং ১০% এর নিচে ভোট প্রদানেও তারা খুশি। পাতানো নির্বাচনকে জনগণের নীরব প্রত্যাখ্যান তাদের চোখে পড়েনি এবং বিবেকে নাড়া দেয়নি। ঢাকার ইসি রুমে বসে জনগণের পক্ষে (এদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো যোগাযোগ-সম্পর্ক নেই) কথা বলা এ মুখচেনা বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম নিরপেক্ষতা আর দেশপ্রেমের নামে দিল্লীর স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত। ফারাক্কা ইস্যু, তিস্তা চুক্তি, টিপাইমুখে বাঁধ, সীমান্ত হত্যা, জনগণকে অন্ধকারে রেখে ভারতকে ট্রানজিট দেয়া, ভারতীয় গোয়েন্দার ‘র’ এর অবাধ বিচরণ ইত্যাদি ইস্যুগুলো তাদের কাছে গুরুত্বহীন। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দিল্লী যা চায় সেটাই বাস্তবায়ন করা। পাহাড়ে সন্তু লারমার শান্তি বাহিনীকে দুই যুগ ভারতের অস্ত্র সরবরাহ তাদের চোখে অপরাধ ছিল না; অপরাধ বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি। দেশে জঙ্গীবাদের ধুঁয়া তুলে ভারতের শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই ব্যক্তিরা শেখ হানিসাকে লেন্দুপ দর্জির ভূমিকায় নিয়ে যেতে এখন মরিয়া। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এই ব্যক্তিগুলো দিল্লীর দৃষ্টিতে গোটা বিশ্বকে দেখতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে দিল্লীই যথেষ্ট; জাতিসংঘ, কমনওয়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেনের প্রয়োজন নেই তাদের বিশ্বাস।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সহিংসতার ঘটনায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি জনগণের প্রত্যাশার কথা চিন্তা করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে এবং অর্থবহ সংলাপ শুরুর তাগিদ দিয়েছেন। সোমবার বান কি মুনের এক মুখপাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতিতে সহিংসতা ও প্রাণহানির বিষয়টিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, মহাসচিব বান কি মুন এর জন্য গভীরভাবে দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় মহাসচিব হাতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি অতিসত্তর ‘অর্থবহ সংলাপ’ শুরুর তাগিদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দিতেও আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন হয়নি জানিয়ে দ্রুত নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধী দলগুলোকে অবিলম্বে সংলাপের বসার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র মেরি হার্ফ এ আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের সদ্য অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র হতাশ। অর্ধেকেরও বেশি আসনে কোনো ভোটগ্রহণ হয়নি এবং বাকিগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নামমাত্র। নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের জনগণের বিশ্বাসযোগ্য মতপ্রকাশের কোনো প্রতিফলন হয়নি। নির্বাচনে সীমিত আকারের অংশগ্রহণ এবং ভোটার উপস্থিতি কম হওয়াকে নৈরাশ্যজনক বলে উল্লে¬খ করেছে কমনওয়েলথ। সংস্থাটির মহাসচিব কমলেশ শর্মা এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনের পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কমনওয়েলথ। কমনওয়েলথ সনদ অনুযায়ী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রত্যেক ব্যক্তির অংশগ্রহণের অধিকারসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার বিষয়টিতে সরকার, সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। সে জন্য দ্রুত অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সামনে এগোনোর পথ খোঁজার জন্য সংলাপের ধারায় অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জনগণের মতামত পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে পারে। অর্ধেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগ জয় লাভ করেছে উল্লে¬খ করে যুক্তরাজ্য ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের সিনিয়র মিনিস্টার ব্যারোনেস সাঈদা ওয়ারসি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়ায় জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে সেসব আসনে ভোট পড়েছে অনেক কম। এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ চায় উল্লে¬খ করে বিবৃতিতে বলা হয়, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ও ভবিষ্যতে সহিংসতা এড়িয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার পথ খুঁজতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের এক সঙ্গে কাজ করা জরুরি। বাংলাদেশের নির্বাচন চরম হতাশাব্যাঞ্জক উল্লেখ করে কানাডার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী জন ব্যায়ার্ড বলেছেন, খুব শিগগিরই সব দলের সত্যিকার অংশগ্রহণে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনে সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতায় পৌঁছা উচিত। যাতে সব বাংলাদেশী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে পায়। চলমান সংকট দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে উল্লে¬খ করে জন ব্যায়ার্ড বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসলে দেশের অর্থনীতিতে তার খারাপ প্রভাব পড়বে। কানাডার মন্ত্রী বলেন, দেশের সংসদীয় আসনগুলোর অর্ধেক কোন প্রতিযোগিতা ছাড়া জিতে যাওয়া আসলেই খুব হতাশাব্যাঞ্জক।
অনলাইন ব্লুমবার্গের সম্পাদকীয়তে ‘বাংলাদেশ নীডস রিয়েল ইলেকশন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে জয়লাভের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বলা হয় বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকের পরাজয় হয়েছে। রক্তপাত, বিরোধী দলের বয়কট ও বিশেষ করে প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি না থাকার বিষয়গুলো নির্বাচনকে কলঙ্কিত করেছে। ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের তিক্তভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন প্রয়োজন। এমনকি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সদস্যরাও গোপনে বিষয়টি স্বীকার করেন। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এ দাবি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত, যা বেশির ভাগ বাংলাদেশীই চান। আরেকটি পথ হতে পারে সব দলের অংশগ্রহণে একটি জোট সরকার গঠন। বলা হয় বিএনপি আশা করছে, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেনাবাহিনী দলটির পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল মনে করছে দলটির উদার আচরণে সেনাবাহিনী তাদের প্রতি অনুগত। তারা সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে সক্ষম হবে। দুটি দলের এমন ধারণাই ‘বিপজ্জনভাবে ইতিবাচক’। জরুরি ভিত্তিতে সকল দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি প্রকৃত নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে এ সম্পাদকীয়তে। বিশ্বখ্যাত মিডিয়া সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, নিউজউইক, নিউইয়র্ক টাইম, এপি, এএফপি, হেরাল্ড টিবিউন, ডয়সেভেলেসহ অধিকাংশ পত্রিকার রিপোর্ট ও প্রতিবেদনে প্রায় একই সুর দেখা যায়। বাংলাদেশের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিডিয়াগুলো সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তবে ব্যতিক্রম শুধু ভারতের মিডিয়াগুলো। ভারতের কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সমর্থনপুষ্ট কিছু বুদ্ধিজীবী ছাড়া বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রায় সব দল এবং বিশিষ্টজন। ভারতের বামধারার দলগুলো এ ধরনের নির্বাচন নিয়ে হতবাক। তারা নীরবতার মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনের প্রতিবাদ জানান। তবে ভারত সরকারের বাংলাদেশের জনগণের বদলে আওয়ামী লীগের প্রতি অন্ধ সমর্থনের তীব্র প্রতিবাদ করছেন। বিজেপি আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কোনো দলের পক্ষে নেই। কংগ্রেসের বাইরে দিল্লী ও কোলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লীর কূটনীতির শিষ্টাচার বহির্ভূত ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তাদের বক্তব্য ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে না। ভারতের জনগণের মতামতের বিপক্ষে গিয়ে কংগ্রেসের এ আচরণের চরমমূল্য দিতে হবে আসন্ন নির্বাচনে। তবে কংগ্রেস সমর্থিত মিডিয়া বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচনে দারুণ খুশি। দিল্লীর নীল নকশায় নির্বাচনের ফলাফলকে ‘উপভোগ’ করছে। দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার খবরটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। ‘হাসিনা হ্যাজ গন বাই দ্য বুক, সেইস ইন্ডিয়া; ইউএস ফেবারস ফ্রেস ইলেকসনস’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ভারত নির্বাচনের পক্ষে দেয়া বিবৃতিতে একে বাংলাদেশ সরকারের ‘সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ‘এ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের আশা আকাক্সক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন হয়নি।’ সালমান খুরশিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে আমরা বাংলাদেশের পাশে রয়েছি।’ বাংলাদেশের নির্বাচনে শেখ হাসিনা এবং তার দলের বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকা বলছে, এটি ভারতের জন্য সুসংবাদ বয়ে এনেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঢাকা-নয়াদিল্লীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো মজবুত হবে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে এটি বিরাট ভূমিকা রাখবে। ‘উইথ শেখ হাসিনা ব্যাক ইন পাওয়ার, ইন্ডিয়া ক্যান সিক্যুর ইটস ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের পর যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ককে অধিক গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে দ্রুত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের পরামর্শ দিয়েছে হিন্দুস্থান টাইমস। পত্রিকাটির মতে, ঢাকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের অর্থনীতিকেই কেবল সমৃদ্ধ করবে না, ওই অঞ্চলের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণেও এটি কাজে আসবে। ‘হাসিনা অফারস অলিভ ব্রাঞ্চ টু জিয়া, সেইস উইন লিজিটিম্যাট’ শিরোনামে প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ‘উইল রিজলভ ইস্যুজ উইথ ইন্ডিয়া ভায়া টকস’ প্রতিবেদনে বলা হয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও নির্বাচন বৈধ হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘জঙ্গিবাদ উৎখাতের প্রতিশ্রুতি হাসিনার’। প্রতিবেদনের পুরোটা জুড়েই ছিল হাসিনার সংবাদ সম্মেলন। কোলকাতার আজকাল পত্রিকায় ‘খালেদাকে হাসিনা : মৌলবাদ ছেড়ে এলে কথা বলবো’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সংবাদ সম্মেলনে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছিলো তাকে (হাসিনা)।’
ভারতের পত্রপত্রিকার সুরে দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩১ আসন লাভ করায় নাচানাচি করলেও বিবেকবান এবং দল নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা উদ্বিগ্ন। তারা ভোটের আগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছেন। দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরামর্শ উপেক্ষা করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকারের কবর দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গেও তারা কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী এদেশের জনগণের সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু এ নির্বাচনে মাঠে নেমে তারা কী দিল্লীর তল্পিবাহকদের ইচ্ছা পূরণ করলো? সম্প্রতি চ্যানেল আই এর তৃতীয় মাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শহিদুজ্জামান বলেছেন, সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। এখনো সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে সেনাবাহিনী। কিন্তু তারা এধরনের পাতানো নির্বাচনে মাঠে নেমেছে। যা মানুষ ভালভাবে নেয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। কিন্তু তারা নির্বাচনের সময় মাঠে নামলো কেন সেটা মানুষ প্রশ্ন করছে। তারা কী ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকারকে সহায়তা করতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? কারণ তারাতো জনগণের। জনগণ যে ভোটে নেই তারা সে ভোটকে নির্বিঘœ করতে মাঠে নামতে পারেন না। তবে আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কখনো জনগণের বিপক্ষে যাবে না।
বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। দলের সভাপতিম-লীর সদস্য যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কঠোর থেকে নরম সুর করেছেন। বলেছেন, নির্বাচন সর্বজন গ্রহণযোগ্য হয়নি। আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডিস্থ রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলার নেতা ও ঢাকা অঞ্চলের নতুন সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, নির্বাচন পাঁচ বছরের জন্য হলেও আমরা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকবো একথা বলছি না। বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা হলে নতুন নির্বাচন হতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ একটি নতুন নির্বাচনের কথা বলছেন।
আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে আওয়ামী লীগের মুখপত্র সুর নরম করলেও আওয়ামী লীগপন্থী বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচনকে শেখ হাসিনার ‘সফলতা’ হিসেবে অবিহিত করছেন। প্লট, ফ্ল্যাট, বিশেষ সুবিধা, চাকরি (বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রাষ্ট্রদূত, ব্যাংক-বীমার পরিচালক, দপ্তর-কর্পোরেশনের দায়িত্ব ইত্যাদি), বদলি বাণিজ্যে আর্থিক উন্নতির মাধ্যমে ৫ বছরে যারা ফুলে ফেপে উঠেছেন ভোটের পর তারা কোমড় বেঁধে মাঠে নেমেছেন। সামগ্রিক বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনের টকশো, আলোচনা, সভা-সেমিনারে তারা ‘দাঁত কেলিয়ে হাসছেন’ এবং শেখ হাসিনাকে নমনীয় না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। জাতিসংঘসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর ভূমিকার সমালোচনা করে তারা দিল্লীর ভূমিকার প্রশংসা করছেন। নির্বাচন কমিশনের রহস্যজনক ভূমিকা এবং ১০% এর নিচে ভোট প্রদানেও তারা খুশি। পাতানো নির্বাচনকে জনগণের নীরব প্রত্যাখ্যান তাদের চোখে পড়েনি এবং বিবেকে নাড়া দেয়নি। ঢাকার ইসি রুমে বসে জনগণের পক্ষে (এদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো যোগাযোগ-সম্পর্ক নেই) কথা বলা এ মুখচেনা বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম নিরপেক্ষতা আর দেশপ্রেমের নামে দিল্লীর স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দিতে অভ্যস্ত। ফারাক্কা ইস্যু, তিস্তা চুক্তি, টিপাইমুখে বাঁধ, সীমান্ত হত্যা, জনগণকে অন্ধকারে রেখে ভারতকে ট্রানজিট দেয়া, ভারতীয় গোয়েন্দার ‘র’ এর অবাধ বিচরণ ইত্যাদি ইস্যুগুলো তাদের কাছে গুরুত্বহীন। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দিল্লী যা চায় সেটাই বাস্তবায়ন করা। পাহাড়ে সন্তু লারমার শান্তি বাহিনীকে দুই যুগ ভারতের অস্ত্র সরবরাহ তাদের চোখে অপরাধ ছিল না; অপরাধ বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি। দেশে জঙ্গীবাদের ধুঁয়া তুলে ভারতের শান্তি প্রতিষ্ঠায় এই ব্যক্তিরা শেখ হানিসাকে লেন্দুপ দর্জির ভূমিকায় নিয়ে যেতে এখন মরিয়া। সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এই ব্যক্তিগুলো দিল্লীর দৃষ্টিতে গোটা বিশ্বকে দেখতে অভ্যস্ত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে দিল্লীই যথেষ্ট; জাতিসংঘ, কমনওয়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেনের প্রয়োজন নেই তাদের বিশ্বাস।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সহিংসতার ঘটনায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি জনগণের প্রত্যাশার কথা চিন্তা করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে এবং অর্থবহ সংলাপ শুরুর তাগিদ দিয়েছেন। সোমবার বান কি মুনের এক মুখপাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতিতে সহিংসতা ও প্রাণহানির বিষয়টিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়, মহাসচিব বান কি মুন এর জন্য গভীরভাবে দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় মহাসচিব হাতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি অতিসত্তর ‘অর্থবহ সংলাপ’ শুরুর তাগিদ দিয়ে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দিতেও আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন হয়নি জানিয়ে দ্রুত নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধী দলগুলোকে অবিলম্বে সংলাপের বসার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র মেরি হার্ফ এ আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের সদ্য অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র হতাশ। অর্ধেকেরও বেশি আসনে কোনো ভোটগ্রহণ হয়নি এবং বাকিগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল নামমাত্র। নির্বাচনের ফলাফলে বাংলাদেশের জনগণের বিশ্বাসযোগ্য মতপ্রকাশের কোনো প্রতিফলন হয়নি। নির্বাচনে সীমিত আকারের অংশগ্রহণ এবং ভোটার উপস্থিতি কম হওয়াকে নৈরাশ্যজনক বলে উল্লে¬খ করেছে কমনওয়েলথ। সংস্থাটির মহাসচিব কমলেশ শর্মা এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনের পরিস্থিতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে কমনওয়েলথ। কমনওয়েলথ সনদ অনুযায়ী অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রত্যেক ব্যক্তির অংশগ্রহণের অধিকারসহ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার বিষয়টিতে সরকার, সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। সে জন্য দ্রুত অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সামনে এগোনোর পথ খোঁজার জন্য সংলাপের ধারায় অগ্রসর হওয়া বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে জনগণের মতামত পুরোপুরি প্রতিফলিত হতে পারে। অর্ধেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই আওয়ামী লীগ জয় লাভ করেছে উল্লে¬খ করে যুক্তরাজ্য ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের সিনিয়র মিনিস্টার ব্যারোনেস সাঈদা ওয়ারসি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না হওয়ায় জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে সেসব আসনে ভোট পড়েছে অনেক কম। এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের ঘোষিত ফলাফল আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ চায় উল্লে¬খ করে বিবৃতিতে বলা হয়, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ও ভবিষ্যতে সহিংসতা এড়িয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার পথ খুঁজতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের এক সঙ্গে কাজ করা জরুরি। বাংলাদেশের নির্বাচন চরম হতাশাব্যাঞ্জক উল্লেখ করে কানাডার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী জন ব্যায়ার্ড বলেছেন, খুব শিগগিরই সব দলের সত্যিকার অংশগ্রহণে পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনে সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতায় পৌঁছা উচিত। যাতে সব বাংলাদেশী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে পায়। চলমান সংকট দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে উল্লে¬খ করে জন ব্যায়ার্ড বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসলে দেশের অর্থনীতিতে তার খারাপ প্রভাব পড়বে। কানাডার মন্ত্রী বলেন, দেশের সংসদীয় আসনগুলোর অর্ধেক কোন প্রতিযোগিতা ছাড়া জিতে যাওয়া আসলেই খুব হতাশাব্যাঞ্জক।
অনলাইন ব্লুমবার্গের সম্পাদকীয়তে ‘বাংলাদেশ নীডস রিয়েল ইলেকশন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে জয়লাভের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বলা হয় বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকের পরাজয় হয়েছে। রক্তপাত, বিরোধী দলের বয়কট ও বিশেষ করে প্রকৃত ভোটার উপস্থিতি না থাকার বিষয়গুলো নির্বাচনকে কলঙ্কিত করেছে। ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাংলাদেশের তিক্তভাবে বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন প্রয়োজন। এমনকি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সদস্যরাও গোপনে বিষয়টি স্বীকার করেন। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। এ দাবি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত, যা বেশির ভাগ বাংলাদেশীই চান। আরেকটি পথ হতে পারে সব দলের অংশগ্রহণে একটি জোট সরকার গঠন। বলা হয় বিএনপি আশা করছে, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেনাবাহিনী দলটির পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দল মনে করছে দলটির উদার আচরণে সেনাবাহিনী তাদের প্রতি অনুগত। তারা সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে সক্ষম হবে। দুটি দলের এমন ধারণাই ‘বিপজ্জনভাবে ইতিবাচক’। জরুরি ভিত্তিতে সকল দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি প্রকৃত নির্বাচন আয়োজনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে এ সম্পাদকীয়তে। বিশ্বখ্যাত মিডিয়া সিএনএন, বিবিসি, আলজাজিরা, নিউজউইক, নিউইয়র্ক টাইম, এপি, এএফপি, হেরাল্ড টিবিউন, ডয়সেভেলেসহ অধিকাংশ পত্রিকার রিপোর্ট ও প্রতিবেদনে প্রায় একই সুর দেখা যায়। বাংলাদেশের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিডিয়াগুলো সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তবে ব্যতিক্রম শুধু ভারতের মিডিয়াগুলো। ভারতের কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সমর্থনপুষ্ট কিছু বুদ্ধিজীবী ছাড়া বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রায় সব দল এবং বিশিষ্টজন। ভারতের বামধারার দলগুলো এ ধরনের নির্বাচন নিয়ে হতবাক। তারা নীরবতার মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচনের প্রতিবাদ জানান। তবে ভারত সরকারের বাংলাদেশের জনগণের বদলে আওয়ামী লীগের প্রতি অন্ধ সমর্থনের তীব্র প্রতিবাদ করছেন। বিজেপি আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কোনো দলের পক্ষে নেই। কংগ্রেসের বাইরে দিল্লী ও কোলকাতার বুদ্ধিজীবীদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লীর কূটনীতির শিষ্টাচার বহির্ভূত ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তাদের বক্তব্য ধর্মনিরপেক্ষ ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে না। ভারতের জনগণের মতামতের বিপক্ষে গিয়ে কংগ্রেসের এ আচরণের চরমমূল্য দিতে হবে আসন্ন নির্বাচনে। তবে কংগ্রেস সমর্থিত মিডিয়া বাংলাদেশের পাতানো নির্বাচনে দারুণ খুশি। দিল্লীর নীল নকশায় নির্বাচনের ফলাফলকে ‘উপভোগ’ করছে। দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার খবরটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। ‘হাসিনা হ্যাজ গন বাই দ্য বুক, সেইস ইন্ডিয়া; ইউএস ফেবারস ফ্রেস ইলেকসনস’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ভারত নির্বাচনের পক্ষে দেয়া বিবৃতিতে একে বাংলাদেশ সরকারের ‘সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াতেই বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ‘এ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের আশা আকাক্সক্ষার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিফলন হয়নি।’ সালমান খুরশিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তবে আমরা বাংলাদেশের পাশে রয়েছি।’ বাংলাদেশের নির্বাচনে শেখ হাসিনা এবং তার দলের বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকা বলছে, এটি ভারতের জন্য সুসংবাদ বয়ে এনেছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঢাকা-নয়াদিল্লীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো মজবুত হবে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক উন্নয়ন এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে এটি বিরাট ভূমিকা রাখবে। ‘উইথ শেখ হাসিনা ব্যাক ইন পাওয়ার, ইন্ডিয়া ক্যান সিক্যুর ইটস ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের পর যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ককে অধিক গুরুত্ব দেবে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে দ্রুত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের পরামর্শ দিয়েছে হিন্দুস্থান টাইমস। পত্রিকাটির মতে, ঢাকার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের অর্থনীতিকেই কেবল সমৃদ্ধ করবে না, ওই অঞ্চলের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণেও এটি কাজে আসবে। ‘হাসিনা অফারস অলিভ ব্রাঞ্চ টু জিয়া, সেইস উইন লিজিটিম্যাট’ শিরোনামে প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করা হয়। দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ‘উইল রিজলভ ইস্যুজ উইথ ইন্ডিয়া ভায়া টকস’ প্রতিবেদনে বলা হয় প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলেও নির্বাচন বৈধ হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘জঙ্গিবাদ উৎখাতের প্রতিশ্রুতি হাসিনার’। প্রতিবেদনের পুরোটা জুড়েই ছিল হাসিনার সংবাদ সম্মেলন। কোলকাতার আজকাল পত্রিকায় ‘খালেদাকে হাসিনা : মৌলবাদ ছেড়ে এলে কথা বলবো’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সংবাদ সম্মেলনে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছিলো তাকে (হাসিনা)।’
ভারতের পত্রপত্রিকার সুরে দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল আওয়ামী লীগ সমর্থিত বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩১ আসন লাভ করায় নাচানাচি করলেও বিবেকবান এবং দল নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা উদ্বিগ্ন। তারা ভোটের আগে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছেন। দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরামর্শ উপেক্ষা করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে নির্বাচনের নামে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকারের কবর দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গেও তারা কথা বলেছেন। তাদের বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী এদেশের জনগণের সঙ্গে থেকেছে। কিন্তু এ নির্বাচনে মাঠে নেমে তারা কী দিল্লীর তল্পিবাহকদের ইচ্ছা পূরণ করলো? সম্প্রতি চ্যানেল আই এর তৃতীয় মাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শহিদুজ্জামান বলেছেন, সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। এখনো সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে সেনাবাহিনী। কিন্তু তারা এধরনের পাতানো নির্বাচনে মাঠে নেমেছে। যা মানুষ ভালভাবে নেয়নি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। কিন্তু তারা নির্বাচনের সময় মাঠে নামলো কেন সেটা মানুষ প্রশ্ন করছে। তারা কী ভোটারবিহীন নির্বাচনে সরকারকে সহায়তা করতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল? কারণ তারাতো জনগণের। জনগণ যে ভোটে নেই তারা সে ভোটকে নির্বিঘœ করতে মাঠে নামতে পারেন না। তবে আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কখনো জনগণের বিপক্ষে যাবে না।
0 comments:
Post a Comment